পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না, অথচ আদালতে গিয়ে জামিন পেলেন ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদের দুই সহযোগী
বিদেশে পলাতক ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী তাঁরা। তাঁদের একজন মোবারক হোসেন ওরফে ইমন ও অন্যজন বোরহান উদ্দিন। নির্মাণাধীন ভবনের মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি, চাঁদা না পেয়ে গুলি, প্রকাশ্যে রাস্তায় গুলি করে হত্যা—এমন নানা ঘটনায় ঘুরেফিরে এসেছে তাঁদের নাম। চট্টগ্রাম নগর পুলিশ তাঁদের হন্যে হয়ে খুঁজছে। পুলিশ খুঁজে না পেলেও উচ্চ আদালতে হাজির হয়ে তাঁরা জামিন পেয়েছেন। চট্টগ্রামের আলোচিত জোড়া খুনের মামলায় দুই ‘সন্ত্রাসী’ গত ১ ফেব্রুয়ারি ছয় সপ্তাহের জন্য জামিন পান। আদেশটি গত ২৯ মার্চ বাকলিয়া থানায় আসার পর জামিনের বিষয়ে জানতে পারে পুলিশ।
দুই ‘সন্ত্রাসীর’ জামিন পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ তাঁদের খুঁজছে। এরই মধ্যে তাঁরা জামিন পেয়েছেন জোড়া খুনের মামলায়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষকে জানানো হচ্ছে।
২০২৫ সালের বছরের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। ওই রাতে সন্ত্রাসীরা বাকলিয়া এক্সেস রোডে এলোপাতাড়ি গুলি করে প্রাইভেট কারে থাকা বখতিয়ার হোসেন (৩০) ও মো. আবদুল্লাহকে (৩২) হত্যা করেন। নিহত দুজন বড় সাজ্জাদের দল ছেড়ে আসা ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলার অনুসারী হিসেবে পরিচিত। গাড়িতে সরোয়ারও ছিলেন, তবে তিনি বেঁচে যান।
পুলিশ জানায়, পোশাক কারখানা থেকে ঝুট কেনাবেচার নিয়ন্ত্রণ এবং বড় সাজ্জাদের আধিপত্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যে ওই রাতে সরোয়ার হোসেনকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় তাঁর দুই অনুসারীর মৃত্যু হয়েছে। সে রাতে হামলা থেকে প্রাণে বাঁচলেও পরে ৫ নভেম্বর সরোয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। জোড়া খুনের ঘটনার পরদিন ৩১ মার্চ থানায় মামলা হয়। এ মামলায় মোবারক ও বোরহান এজাহারভুক্ত আসামি।
শুধু জোড়া খুন নয়, ‘সন্ত্রাসী’ আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর সরোয়ার হোসেনসহ নগর ও জেলার রাউজান, হাটহাজারীতে খুন-চাঁদাবাজিতেও সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে দুজনের নাম রয়েছে। গত বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় আকবরকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। সরোয়ারকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় গত বছরের ৫ নভেম্বর। এ সময় তিনি চট্টগ্রাম-৮ আসনে (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে ছিলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন এরশাদ উল্লাহসহ আরও পাঁচজন।
কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর বাসায় গুলি করে সন্ত্রাসীরা। মোস্তাফিজুর রহমানের ভাই মুজিবুর রহমান ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ স্মার্ট গ্রুপের কাছে কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা না পেয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি প্রথম দফায় মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলি করেন। গুলিতে বাসার জানালার কাচ ভেঙে যায়। পরে দুই মাসের মাথায় আবার গুলি করে।
সাজ্জাদের সহযোগী মোবারক হোসেন ওরফে ইমন ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের মো. মুসার ছেলে। জোড়া খুন ও ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ সাত মামলার আসামি তিনি। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর কিছু ছবিতে ১৫-২০টি অস্ত্র বহনের প্রমাণ রয়েছে। জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করে এনেছিলেন মোবারক। রায়হানের বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও খুনের আট মামলা।
পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারির ব্যর্থতার কারণে আলোচিত দুই সন্ত্রাসীকে ধরতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের দায়িত্ব হলো সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা করা। যেহেতু তাঁরা জামিন নিয়েছেন, রাষ্ট্রপক্ষ এখন ব্যবস্থা নিতে পারেন।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মফিজুল হক ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।