জীবনযাপন

পুরুষের বন্ধ্যত্ব কেন হয়?

June 10, 2026
2 months ago
By SAJ
পুরুষের বন্ধ্যত্ব কেন হয়?

বেশির ভাগ সময় সন্তান না হওয়ার জন্য আমাদের সমাজ নারীকেই দোষারোপ করে। অথচ বিশ্বজুড়ে প্রজনন সমস্যায় ভোগা দম্পতিদের প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই পুরুষের কোনো না কোনো সমস্যা দায়ী থাকে। বাস্তবে বন্ধ্যত্ব বা ইনফার্টিলিটি নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমান হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

কোনো দম্পতি যদি নিয়মিত যৌন সম্পর্কের পরও এক বছরের মধ্যে সন্তান ধারণে ব্যর্থ হন, তখন তাকে বন্ধ্যত্ব বলা হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা, গঠন বা চলাচলের ত্রুটির কারণে গর্ভধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় যৌনসক্ষমতা স্বাভাবিক থাকলেও পুরুষ বন্ধ্যত্বে আক্রান্ত হতে পারেন।

পুরুষের বন্ধ্যত্বের প্রধান কারণগুলো হলো—

পুরুষ বন্ধ্যত্বের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো, শুক্রাণুর সংখ্যা কম থাকা। একে বলে ওলিগোস্পারমিয়া। স্বাভাবিকের তুলনায় কম শুক্রাণু উৎপন্ন হলে ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করার সম্ভাবনা কমে যায়।

শুধু সংখ্যা নয়, শুক্রাণুর গঠন ও গতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। শুক্রাণু যদি দুর্বল হয় বা সঠিকভাবে চলাচল করতে না পারে, তবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়।

অণ্ডকোষের শিরা ফুলে যাওয়াকে বলে ভেরিকোসিল। এটি অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে শুক্রাণু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি পুরুষ বন্ধ্যত্বের সাধারণ ও চিকিৎসাযোগ্য কারণ।

টেস্টোস্টেরনসহ বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্যহীনতা শুক্রাণুর উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। পিটুইটারি গ্রন্থি বা থাইরয়েডের সমস্যাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

মাম্পস, যৌনবাহিত রোগ, প্রোস্টেটের সংক্রমণ বা অন্যান্য প্রদাহজনিত রোগ অণ্ডকোষের শুক্রাণু উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে পুরুষের বন্ধ্যত্ব দেখা দিতে পারে।

কিছু পুরুষ জন্মগতভাবে প্রজনন অঙ্গের ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। আবার কিছু জিনগত রোগ শুক্রাণু উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

আধুনিক জীবনযাত্রার অনেক অভ্যাস পুরুষের প্রজননক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেমন: ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, মাদকাসক্তি, স্থূলতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, অনিদ্রা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।

কীটনাশক, ভারী ধাতু, শিল্পকারখানার রাসায়নিক পদার্থ বা অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকলে শুক্রাণুর মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই যেসব পুরুষ এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাঁদের বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি থাকতে পারে।

সমস্যা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধ্যত্বের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। সাধারণত সন্তানধারণে ব্যর্থ হওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এটি ধরা পড়ে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে—

যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া, ইরেকশনের সমস্যা, বীর্যপাতের সমস্যা, অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফোলা ভাব, শরীরে হরমোনজনিত পরিবর্তন, মুখ বা শরীরের লোম কমে যাওয়া।

সঠিক চিকিৎসার জন্য কারণ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করে থাকেন—

বীর্য পরীক্ষা

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এর মাধ্যমে শুক্রাণুর সংখ্যা, গতি, আকার ও গুণগত মান মূল্যায়ন করা হয়।

রক্ত পরীক্ষা

বিভিন্ন হরমোনের মাত্রা নির্ণয় করা হয়। এতে হরমোনজনিত সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

আলট্রাসনোগ্রাফি

ভেরিকোসিল বা অন্যান্য শারীরিক ত্রুটি আছে কি না, তা দেখার জন্য আলট্রাসনোগ্রাফি করা হয়ে থাকে।

জিনগত পরীক্ষা

বিশেষ ক্ষেত্রে জিনগত কারণ সন্দেহ হলে এ পরীক্ষা করা হয়।

সুখবর হলো, বর্তমানে পুরুষ বন্ধ্যত্বের অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব।

অনেক সময় শুধু জীবনযাপনে পরিবর্তনের মাধ্যমেই উল্লেখযোগ্য সুফল পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে—ধূমপান ত্যাগ, মাদক ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল পরিহার, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ কমানো।

হরমোনজনিত সমস্যা বা কিছু সংক্রমণের ক্ষেত্রে ওষুধ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ গ্রহণ করা যাবে না।

ভেরিকোসিল বা শুক্রাণু পরিবহনের পথে বাধা থাকলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হয়।

যেসব ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ সম্ভব হয় না, সেখানে আধুনিক প্রজননপ্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।

আইইউআই: প্রস্তুতি শেষে শুক্রাণু সরাসরি জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়।

ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ): ল্যাবরেটরিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়।

ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন: একটি শুক্রাণুকে সরাসরি ডিম্বাণুর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। গুরুতর পুরুষ বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর।

পুরুষের বন্ধ্যত্বে নিচের পরিস্থিতিতে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—

এক বছর নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের পরও সন্তান না হলে।

অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফোলা ভাব থাকলে।

যৌনক্ষমতায় সমস্যা দেখা দিলে।

পূর্বে অণ্ডকোষে আঘাত বা অস্ত্রোপচারের ইতিহাস থাকলে।

ক্যানসারের চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকলে।

পুরুষ বন্ধ্যত্ব কোনো লজ্জার বিষয় নয়। এটি পুরুষত্বের ঘাটতিরও প্রমাণ নয়। এটি একটি স্বাস্থ্য সমস্যা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যার চিকিৎসা সম্ভব। সন্তান না হলে শুধু নারীর পরীক্ষা নয়, স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই একসঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সামাজিক কুসংস্কার ও ভুল ধারণা দূর করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আজ অসংখ্য দম্পতি সফলভাবে সন্তান লাভ করছেন।

অনেকেই এ ধরনের সমস্যায় নানা ধরনের টোটকা ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেন, এতে অকারণ কালক্ষেপণ ছাড়াও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই হতাশ না হয়ে সচেতনতা, সঠিক পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও যথাযথ বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার মাধ্যমে পুরুষ বন্ধ্যত্বের সমাধান সম্ভব।

লেখক: কনসালট্যান্ট, ইনফার্টিলিটি বিভাগ, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।