রিকনসিলিয়েশন ছাড়া সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত থাকে
অপরাধের বিচার জরুরি। সেই সঙ্গে দরকার রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন। তা না হলে সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত থাকে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, পার্বত্য অঞ্চলে সহিংসতা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তেমনি দরকার রিকনসিলিয়েশন।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর ‘ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও জাতীয় পুনর্মিলন’ শীর্ষক অধিবেশনে আলোচকদের বক্তব্যে এসব বিষয় উঠে এসেছে। রাজধানীর একটি হোটেলে সোমবার অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয়। তিন দিনব্যাপী আয়োজনের শেষ দিন ছিল সোমবার।
এ অধিবেশনে বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকা, কম্বোডিয়া, ভারত ও নেপাল থেকে আসা শিক্ষক ও গবেষকেরা ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও রিকনসিলিয়েশনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তবে আলোচক হিসেবে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিশ্বজুড়ে প্রায়ই দেখা যায়, রিকনসিলিয়েশন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, এটিকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি পরিণতি থেকে রক্ষা করার রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিচারহীন জাতীয় রিকনসিলিয়েশন কোনো শান্তি নয়, তা কেবল সংঘাতের মধ্যকার একটি সাময়িক বিরতি মাত্র।
কায়সার কামাল জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৬০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। যার মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশই ছিল শিশু। এই ভয়হীন, আপসহীন প্রজন্ম একটি নতুন দেশ গড়ার জন্য লড়াই করেছিল, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার পাবে এবং অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দলের প্রতিবেদনে প্রাক্কলন করা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে সরকারি তালিকায় শহীদের সংখ্যা ৮৪৩। নতুন আবেদন নেই।
কায়সার কামাল বলেন, সবাই অবগত যে অপশক্তিগুলো এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। দুর্ভাগ্যবশত, দেশ-বিদেশের কিছু গোষ্ঠী রিকনসিলিয়েশনের দোহাই দিয়ে তাদের পক্ষে কথা বলছে। এ ধরনের চিন্তা দেশকে নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে, যার পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ ও অকল্পনীয়। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রিকনসিলিয়েশনের কোনো সুযোগ নেই।
এ অধিবেশন সঞ্চালনা করেন নেপাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারনেশনাল কো-অপারেশন অ্যান্ড এনগেজমেন্টের গবেষণা পরিচালক প্রমোদ জয়সওয়াল। তিনি মনে করেন, ন্যায়বিচার দরকার। তবে রিকনসিলিয়েশন না হলে সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত থাকতে পারে।
জবাবদিহিকে অবশ্যই প্রতিশোধ থেকে আলাদা করতে হবে বলে মনে করেন প্রমোদ জয়সওয়াল। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ সমাজেই জবাবদিহিকে প্রতিশোধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। রিকনসিলিয়েশন মানেই অতীত নিয়ে সম্পূর্ণ একমত হওয়া নয়। আবার এর মানে গুরুতর অন্যায় বা অপরাধগুলোকে ভুলে যাওয়া কিংবা ক্ষমা করে দেওয়াও নয়। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ব্যক্তি ও সম্প্রদায় মর্যাদার সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। ঐতিহাসিক ক্ষোভগুলোকে স্বীকৃতি দিতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে একে অপরের ওপর আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে।
ভারতের রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কারোরি সিং বলেন, যাঁরা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকেন, তাঁরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। দক্ষিণ এশিয়ার পটভূমিতে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে দেখা যাচ্ছে এই স্বেচ্ছাচারিতাই সমস্যার সৃষ্টি করছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার উইটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাদালিৎসো জিলিলো ফিরি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন) হয়েছিল, যা একটি নতুন সমাজ কল্পনার পূর্বশর্ত ছিল। তা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। কারণ, উদারনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত সাম্যের সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে সক্ষম হয়নি।
কম্বোডিয়া গৃহযুদ্ধের শিকার এবং সেখানে রিকনসিলিয়েশনের প্রচেষ্টা ১৯৯১ সালের আগেই শুরু হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন দেশটির সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক নিকি সিঙ্গার। তিনি বলেন, কম্বোডিয়ায় জাতীয় রিকনসিলিয়েশনের আওতায় ১৯৯৮ সালে খেমার রুজ (বিদ্রোহী গোষ্ঠী) সৈন্যদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা এবং নিরস্ত্রীকরণ করা হয়।
নিকি সিঙ্গার মনে করেন, কম্বোডিয়ার বহু মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এমন একটি ভাবনা কাজ করে যে তাঁরা যদি কেবল অতীতের দোষারোপের ওপরই মনোযোগ দিয়ে থাকেন, তবে সামনে এগোতে পারবেন না। সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য তাঁরা কেমন ভবিষ্যৎ ও ঐতিহ্য রেখে যেতে চান, সেটাও ভাবেন।
অধিবেশনের বক্তাদের একজন ছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের অপরাধকারীরা এখনো নিজেদের অপরাধ স্বীকার করতে প্রস্তুত নন। বরং তাঁরা এখনো মানবতার বিরুদ্ধে তাঁদের কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে তৎপর। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা রয়েছে। এখনো দেখা যাচ্ছে সংঘাতরত পক্ষগুলোর উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থান রয়েছে। একইভাবে ২০২৪ সালে গণতন্ত্রকামী আন্দোলনকারীদের যারা হত্যা করেছিল, তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনুশোচনা দেখা যায় না। তারা এখনো আন্দোলনকারীদের চরমপন্থী, উগ্রবাদী বলে অভিযুক্ত করছে।
অবশ্যই এসব সমস্যা সমাধান করতে হবে বলে উল্লেখ করেন নূরুল কবীর। তিনি বলেন, তা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে বোঝাতে হবে যে তাদের কিছু ভুল ছিল। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো এক দিন তা করা সম্ভব হবে। কেবল তখনই সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে সমাজ গঠনের জন্য নতুন যাত্রা শুরু করা যাবে।