বাংলাদেশ

রক্তাক্ত পাখিটি ‘ঠোঁটে করে ছড়িয়ে দেবে প্রতিবাদের ভাষা’

January 13, 2026
3 months ago
By SAJ
রক্তাক্ত পাখিটি ‘ঠোঁটে করে ছড়িয়ে দেবে প্রতিবাদের ভাষা’

প্রায় তিন যুগের পুরোনো আধপোড়া হারমোনিয়ামটি মেঝেতে পড়ে আছে। পুরো কক্ষে ধ্বংসস্তূপের চিহ্ন এখনো তাজা। পোড়া দেয়ালে লেগে আছে ছাই। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে গিটার, তবলা, ঢোল, খোল, একতারাসহ অনেক বাদ্যযন্ত্র। পুড়েছে সব দলিল–দস্তাবেজ, স্মারক, চেয়ার–টেবিল ও অন্যান্য জিনিস। এমন দৃশ্য দেখা গেল বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

মঙ্গলবার উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আগুনে পোড়ানো ধ্বংসস্তূপের প্রদর্শনী করেছে সংগঠনটি। গত ১৯ ডিসেম্বর ওই কার্যালয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। তাতে পুড়ে যাওয়া সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে বিগত ৫৭ বছরে জমানো সব স্মৃতি। বিভিন্ন নথিপত্র, বিখ্যাত শিল্পীদের স্মৃতিবিজড়িত নানা বাদ্যযন্ত্র। রয়েছে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে উদীচীর সব অর্জন ও স্মারক।

কার্যালয়ে হামলার পর উদীচীর শিল্পীদের অবস্থা কেমন হয়েছে, সেই চিত্র তুলে ধরার জন্য ধ্বংসস্তূপের এই প্রদর্শনীতে একটি রক্তাক্ত পাখির অবয়ব রাখা হয়। এই পাখির ডানা কাটার চেষ্টা করা হয়েছে। উড়ে বেড়ানোর স্বাধীন সত্তাকে হননের চেষ্টা করা হয়েছে।

রক্তাক্ত এই প্রতীকী পাখির বর্ণনা দেন উদীচীর কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য রুমি প্রভা। প্রতিবাদের পাখি আজ রক্তাক্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রক্তাক্ত বলেই তার রং লাল, কিন্তু প্রতিবাদী। আমরা এই পাখিকে ঝুলিয়েছি প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। সে ঠোঁটে করে সারা বিশ্বে আমাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে ছড়িয়ে দেবে। আমরা বোঝাতে চাই, ভয় দেখিয়ে কিংবা হামলা করে শিল্পীদের থামানো যায় না।’

‘পুড়েছে ৫৭ বছরের ইতিহাস’

গত ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয় এবং ছায়ানটে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। পরদিন সেগুনবাগিচায় উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয় আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনায় সাংস্কৃতিক সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুড়ে গেছে অসংখ্য সাংস্কৃতিক উপকরণ।

উদীচীর সদস্যরা জানান, সেদিনের আগুনে পুড়েছে সংগঠনটির ৫৭ বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস, নথিপত্র, বাদ্যযন্ত্র, দুর্লভ গ্রন্থ, নাটকের কস্টিউম, প্রপসসহ নানা স্মারক ও অর্জন।

ওই কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে এক ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। এখনো রয়েছে বিভিন্ন উপকরণের পোড়া গন্ধ। কার্যালয়ে এখন ধ্বংসস্তূপ।

সেখানে পড়ে রয়েছে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। সবই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তবলা, এমপ্লিফায়ার, গিটারসহ বিভিন্ন যন্ত্র। একটি হারমোনিয়াম পাওয়া যায় প্রায় ৩৫ বছরের পুরোনো। উদীচীর সদস্যরা জানান, এই হারমোনিয়ামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিখ্যাত সংগীতপরিচালক অজিত রায়ের স্মৃতি। একসময় তিনিও এই হারমোনিয়াম বাজিয়েছিলেন।

এ ছাড়া হারমোনিয়ামটি বাজিয়েছেন ভারতের গণসংগীতশিল্পী অজিত পাণ্ডে, সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক, সংগীতগবেষক ও শিল্পী শুভেন্দু মাইতি, শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদারেরা। এ ছাড়া উদীচীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এই হারমোনিয়ামের সঙ্গে।

উদীচীর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত আছেন সংগঠনের সহসাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক। তিনি জানান, উদীচীর যেকোনো অনুষ্ঠান ও আয়োজনে সবচেয়ে বেশি বাজানো হতো এই হারমোনিয়াম। বিশেষত হারমোনিয়াম বাজিয়েই ’৯০–এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে গান পরিবেশন করেছিলেন উদীচী শিল্পীরা।

একটি বাদ্যযন্ত্রের নাম খোল। যেটি দুই হাতে বাজানো হয়। উদীচীর কার্যালয়ে পুড়ে যাওয়া খোলটির বয়স অন্তত ৪০ বছর। উদীচীর সদস্যরা জানান, তাঁদের ৪০টি ঋতুর স্মৃতি এই খোলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে পোড়া এই খোলও এখন পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপে।

পুড়েছে সত্যেন সেনের হাতে লেখা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৭ বছরের ইতিহাসের সব নথিপত্র পুড়েছে আগুনে। সেখানে ছিল এমন সব স্মৃতিচিহ্ন, যা আর কখনো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। পুড়েছে শিল্পীদের অসংখ্য অর্জন ও স্মারক।

উদীচীর সহসাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক একটি আলমারি দেখান। তিনি প্রথম আলোকে জানান, এই আলমারিতে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৭ বছরের সব অর্জন জমা ছিল। অন্য একটি ছোট আলমারি দেখিয়ে তিনি জানান, সেখানে ছিল লেখক ও উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন সেনের নিজ হাতে লেখা একটি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি। উপন্যাসটির নাম ছিল ‘মহা বিদ্রোহের কাহিনী’।

ইকবালুল হক জানান, এই উপন্যাস প্রকাশিত হয়নি। তিনি বলেন, ‘বলতে গেলে যেসব বাদ্যযন্ত্র ও নথি নষ্ট হয়েছে, তা অমূল্য। আসবাবপত্র যা পুড়েছে, সেটা আমরা পুনরায় জোগাড় করতে পারব। কিন্তু এমন কিছু নথি ও লেখা বই, যা আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না। এককথায় ৫৭ বছরের ইতিহাস পুড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া এসব বাদ্যযন্ত্রে যেসব মানুষের স্পর্শ লেগে আছে, সেটা কোথায় পাব?’