সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নধর্মী তারকা বিড়াল জেবু
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকা হওয়ার জন্য কেবল রক্ত-মাংসের মানুষ হওয়া জরুরি নয়। চারপেয়ে পোষা প্রাণীরাও যে রাজত্ব করতে পারে, তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ বিড়াল জেবু। তবে জেবু আর দশটা সাধারণ পোষা বিড়ালের মতো নয়। জেবু বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিবারের সদস্য এবং তাঁর কন্যা জাইমা রহমানের পোষা বিড়াল। লন্ডন থেকে বাংলাদেশে আসার পর থেকেই জেবু ইন্টারনেট সেনসেশন।
জেবু সাইবেরিয়ান প্রজাতির বিড়াল। দীর্ঘ পশম, উজ্জ্বল চোখ আর গম্ভীর চলনবলনের জন্য সে পরিচিত। তার ফেসবুক পেজের ডেসক্রিপশনে নিজেকে নিয়ে তার রসালো মন্তব্য দেখা যায়, ‘আমি চমৎকার পশম এবং প্রখর বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন একটি সাইবেরিয়ান বিড়াল। মানুষের রাজনীতিতে আমার কোনো আগ্রহ নেই, যদিও মানুষ আমাকে বারবার তাতে টেনে আনে।’
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর যখন তারেক রহমান সপরিবার ঢাকায় অবতরণ করেন, তখন তাঁদের সঙ্গেই লন্ডন থেকে দেশে আসে জেবু। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জাইমা রহমানের কোলে জেবুর খুনসুটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ঘোষণা দেওয়া হয় যে দেশে ফিরেছে জেবু। তবে বিড়াল জেবুর পেজটি ভেরিফায়েড নয়। নেপথ্যে থেকে কে বা কারা পরিচালনা করছেন, সে তথ্যও এখন পর্যন্ত অজানা।
জেবুর জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী। তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোয় ফলোয়ারের সংখ্যা কোনো বড় তারকার চেয়ে কম নয়। জেবুর ফেসবুক পেজে বর্তমানে ২ লাখ ৩ হাজার ফলোয়ার আছে। মজার ব্যাপার হলো, পেজটি মাত্র একজনকে ফলো করে, তিনি জাইমা রহমান। ‘জেবু দ্য ক্যাট’ পেজটি ফেসবুকে স্যাটায়ার/প্যারোডি ক্যাটাগরিতে প্রকাশ করা হয়েছে। ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে তার ফলোয়ার সংখ্যা ২০ হাজার। মাত্র ৩৪টি পোস্টেই সে এই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
জেবুর পেজ থেকে দেওয়া প্রতিটি পোস্টই যেন ইন্টারনেটে ঝোড়ো হাওয়া বইয়ে দেয়। ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে জেবুর একটি ছবি পোস্ট করা হয়। সেখানে ৩ হাজারের বেশি লাইক এবং ১০১টি শেয়ার পড়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়, যেখানে জেবুর পাশেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘরোয়া পরিবেশে ক্যারাম খেলতে দেখা যায়। এই ভিডিও ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দেখেছেন। ২৭ মার্চ তারেক রহমানের ল্যাপটপে কাজ করার একটি ছবির পেছনে জেবুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘সুপারভাইজিং মাই হুম্যানস স্ক্রিন টাইম।’ এ পোস্টে ১৩ হাজারের বেশি রিঅ্যাকশন এবং প্রায় ৫০০টি শেয়ার হয়। কমেন্ট বক্সে আরাফাত প্রিয়াম লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী জেবু তার সহকারীকে তদারক করছেন। সামিয়া সিদ্দিকা লিখেছেন, জেবু বডিগার্ড হিসেবে ডিউটি করছে।
জাইমা রহমান তাঁর ইনস্টাগ্রামে জেবুকে নিয়ে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমাকে স্বীকার করতেই হবে, বাংলাদেশে জেবুকে ঘিরে যে পরিমাণ কৌতূহল, তা দেখে আমি একই সাথে অবাক এবং আনন্দিত। যদি সে ব্যাপারটা বুঝত! যেকোনো প্রাণীর যত্ন নেওয়া এক বিরাট দায়িত্ব। সর্বোপরি, এটি একটি জীবন—আল্লাহর সৃষ্টি। যখন আমি প্রথম জেবুকে একটি বিড়ালছানা হিসেবে বাড়িতে এনেছিলাম, আমি কখনো কল্পনাও করিনি সে আমাদের পরিবারের এতটা গভীরভাবে অংশ হয়ে উঠবে। এমনও সময় গেছে যখন আমার বাবা-মা বাড়ি ফিরে আমার খোঁজ নেওয়ার আগে জেবুর খোঁজ নিতেন! আমার মা যখন বাগানে কাজ করতেন বা পাড়ার মধ্যে দিয়ে হাঁটতেন, তখন সে তার চারপাশে লাফালাফি করত। আর সন্ধ্যায় সে বাবার কোলে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকত। বাবা যখন তার কাজের ফোনকলগুলো শেষ করতেন, তখন সে মাথার মালিশ উপভোগ করত। আর আমার কথা বলতে গেলে, জেবু যেন সব সময় আমার আবেগ বুঝতে পারত, তার ছোট্ট থাবা আর তুলতুলে পেট দিয়ে আমাকে সান্ত্বনা দিত, যা একমাত্র সে–ই পারত।’
জায়মা আরও লিখেছেন, ‘যেকোনো পোষ্যের মালিকই জানেন যে একটি প্রাণীকে নিয়ে বাড়ি বদলানো কতটা কঠিন হতে পারে। জেবু এখন মহাদেশ পেরিয়ে এক সম্পূর্ণ নতুন জগতে পাড়ি দিয়েছে। তার ছোট্ট আত্মার জন্য, এটি এমন এক বিশাল পরিবর্তন যা আমরা মানুষরা হয়তো কখনোই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারব না। জেবুর মাধ্যমে আমাদের পরিবার ধৈর্য, ছোট-বড় সকল প্রাণীর প্রতি সহানুভূতি এবং একই ভাষা না থাকা সত্ত্বেও একে অপরকে ভালোবাসা ও যত্ন করার সৌন্দর্য সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছে। সর্বোপরি, ভালোবাসা প্রজাতি–নির্বিশেষে সকলের জন্য।
‘আমরা সব সময়ই পশু–পাখিদের সঙ্গে বড় হয়েছি। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, অন্য কোনো জীবন্ত প্রাণীর যত্ন নেওয়ার সৌভাগ্য যার হয়, সে নিজের সম্পর্কে যতটা আশা করে, তার চেয়ে অনেক বেশি জানতে পারে। জেবু সম্পর্কে একটি মজার তথ্য: সে মিউ মিউ করে না! সে কখনোই করেনি, এমনকি আলমারির ভেতরে আটকে থাকলেও না। এর পরিবর্তে, সে খুশি বা অবাক হলে পাখির মতো নরম সুরে কিচিরমিচির করে, অনুমতি ছাড়া কোলে নিলে মৃদু প্রতিবাদে গোঙিয়ে ওঠে। যেসব বিড়ালকে তার পছন্দ নয়, তাদের দিকে বেশ আক্রমণাত্মকভাবে চিৎকার করতে পারে!’
জেবুকে নিয়ে নেট নাগরিকদের রসবোধও দেখার মতো। ১৩ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানানোর পোস্টে মালিহা তাবাসসুম কমেন্ট করেছেন, ‘আমরা বিড়াল মন্ত্রণালয় চাই!’ রাইয়ান ফেরদৌস লিখেছেন, ‘আমরা জেবুকে ক্যাট প্রাইম মিনিস্টার হিসেবে চাই।’ এমনকি ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের সময় জেবু ভোটারদের সচেতনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট করেছিল, যা ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।
তারেক রহমান একবার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বিড়ালটি আমার মেয়ের। ও এখন অবশ্য সবারই হয়ে গেছে। আমরা সবাই ওকে আদর করি।’