বাংলাদেশ

সেন্ট মার্টিন দ্বীপে শেষ হলো ভ্রমণের সময়সীমা, দুই মাসে গেলেন কত পর্যটক

January 31, 2026
2 months ago
By SAJ
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে শেষ হলো ভ্রমণের সময়সীমা, দুই মাসে গেলেন কত পর্যটক

বঙ্গোপসাগরের প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের ভ্রমণের সময়সীমা শেষ হয়েছে আজ শনিবার। এরপর আগামীকাল ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত টানা ৯ মাস দ্বীপে পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধ থাকবে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস পর্যটকদের ভ্রমণের অনুমতি থাকলেও রাতযাপনের অনুমতি না থাকায় নভেম্বর মাসে পর্যটকেরা দ্বীপে ভ্রমণ করেননি। মূলত ডিসেম্বর-জানুয়ারি—এই দুই মাস দ্বীপে পর্যটকেরা ভ্রমণ করেছেন। এ ২ মাসে ১ লাখ ১৭ হাজার পর্যটক দ্বীপে ভ্রমণ করেছেন।

দ্বীপের কয়েকজন বাসিন্দা মুঠোফোনে জানিয়েছেন, আজ বিকেলে ছয়টি জাহাজ ও কয়েকটি কাঠের ট্রলারে অন্তত তিন হাজার পর্যটক, হোটেল-মোটেলের কর্মচারী ও ব্যবসায়ী দ্বীপ ছেড়েছেন। বিকেল চারটার পর দ্বীপের দুই শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ আর অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে পুরো দ্বীপ।

পর্যটকবাহী জাহাজমালিকদের সংগঠন ‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’–এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর প্রথম আলোকে বলেন, আজ সকাল সাতটার দিকে শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা জেটিঘাট থেকে ছয়টি জাহাজ সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। জাহাজগুলোতে কোনো পর্যটক ছিল না। বেলা একটার দিকে জাহাজগুলো ১২০ কিলোমিটারের সাগরপথ পাড়ি দিয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জেটিঘাটে পৌঁছেছে। বিকেল তিনটা নাগাদ সেখানে অবস্থান করা অন্তত ২ হাজার ৫০০ পর্যটক নিয়ে জাহাজগুলো পুনরায় কক্সবাজার শহরে ফিরে আসবে। হোটেল–মোটেলের আরও ৫০০ কর্মী কয়েকটি কাঠের ট্রলারে দ্বীপ ছেড়েছেন।

হোসাইনুল ইসলাম বাহাদুর বলেন, গত ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস পর্যটকদের জন্য সেন্ট মার্টিন উন্মুক্ত করে দেয় সরকার। কিন্তু রাতযাপনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রথম মাসে (নভেম্বর) কোনো পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে যাননি। পরের দুই মাসে (ডিসেম্বর ও জানুয়ারি) অন্তত ১ লাখ ১৭ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেন, যা গত বছরের তুলনায় দেড়–দুই হাজার বেশি। দৈনিক ২ হাজার করে ধরলে ২ মাসে ভ্রমণে যাওয়ার কথা ছিল ১ লাখ ২০ হাজার পর্যটকের।

৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত বছরের ২২ অক্টোবর ১২টি নির্দেশনাসংবলিত প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে বলা হয়, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৯ মাস বন্ধ থাকার পর ১ নভেম্বর থেকে তিন মাসের জন্য সেন্ট মার্টিন উন্মুক্ত থাকবে। দৈনিক দুই হাজার পর্যটক দ্বীপ ভ্রমণে যেতে পারবেন। তবে নভেম্বর মাসে দ্বীপে রাত যাপন করতে পারবেন না। ডিসেম্বর–জানুয়ারি—এই দুই মাস রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয় এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ যেকোনো জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। চলাচল নিষিদ্ধ করা হয় সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানের। তা ছাড়া ভ্রমণকালে পলিথিন বহন ও ব্যবহারের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনি প্যাক, ৫০০ বা ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিক বোতলের ব্যবহারও নিরুৎসাহিত করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহবুব পাশা প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটকের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ–প্রতিবেশ ক্ষত সারিয়ে উঠছে, ফিরছে জীববৈচিত্র্যও। এবার পর্যটকের জন্য প্রতিবেশসংকটাপন্ন ছেঁড়াদিয়ায় ভ্রমণ নিষিদ্ধ ছিল। যেকারণে দ্বীপের বালুচরে আবারও শামুক-ঝিনুকের বিস্তার দেখা গেছে। সৈকতে বারবিকিউ ও আলোকসজ্জা না হওয়ায় নতুন সামুদ্রিক গুল্ম ও গাছপালা জন্মেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে দ্বীপটিকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, সেন্ট মার্টিন দ্বীপসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে পরিবেশ মন্ত্রণালয়।

দ্বীপ ছাড়ছেন পর্যটকেরা

আজ বেলা ১১টা থেকে কাঠের ট্রলারে করে বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও ব্যবসায়ী দ্বীপ ছেড়ে টেকনাফে ফিরেছেন। একটি ট্রলারে ২০০-৩০০ জন করে বোঝাই করা হচ্ছে। ভোলার লাল মোহনের সাকিব আহমদ (৩৬) বলেন, গত তিন মাস তিনি দ্বীপের একটি হোটেলে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছেন। আজ পর্যটকেরা গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছেন। দ্বীপের সব হোটেল খালি হয়ে যাচ্ছে। তাঁরও চাকরিও শেষ। তাই কাঠের ট্রলারে টেকনাফে ফিরে যাচ্ছেন। সেখান থেকে রাতের বাসে ঢাকায় যাবেন।

ঢাকার মগবাজারের ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন (৪৫) বলেন, গত ডিসেম্বর মাসে তিনি টেকনাফ থেকে স্পিডবোটে সেন্ট মার্টিনে এসেছিলেন। একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। আজ থেকে রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকছে। তাই তিনিও ঢাকায় ফিরে যাচ্ছেন।

আজ সকালে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতে নীল জলের স্বচ্ছ পানিতে গোসল করছিলেন কয়েকজন পর্যটক। তাঁদের একজন ঢাকার বারিধারার কেরামত আলী (৪৫)। তিনি বলেন, এমভি কর্ণফুলী জাহাজে করে তাঁরা তিন বন্ধু ২৮ জানুয়ারি সেন্ট মার্টিনে এসেছিলেন। পায়ে হেঁটে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখেন। আজ বেলা তিনটায় জাহাজে উঠে গন্তব্যে ফিরবেন। তার আগে শেষবারের মতো নীল জলে গোসল সেরে নিচ্ছেন।

সৈকতের পাশে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাংলো বাড়ি সমুদ্রবিলাস। কয়েকজন পর্যটক ফটকে দাঁড়িয়ে সমুদ্রবিলাসের ছবি তোলেন। পর্যটকদের একজন মফিজুর রহমান বলেন, সেন্ট মার্টিনের পরিবেশের সৌন্দর্য দেখে তিনি মুগ্ধ। পর্যটক সীমিত করায় দ্বীপের সম্পদ রক্ষা পাচ্ছে।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দোকান মালিক সমিতির সহসভাপতি মৌলভি নুর আহমদ বলেন, টানা দুই মাস বিপুল পর্যটকে সেন্ট মার্টিন সরগরম ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যও কিছুটা চাঙা ছিল। আজ বেলা তিনটার পর থেকে পুরো সেন্ট মার্টিন পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। দুই শতাধিক হোটেল–রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ বন্ধ পড়ে যাবে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ১০-১২টি প্রতিষ্ঠানের অন্তত ৩ হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বেন।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার অঞ্চলের প্রধান ও অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, জাহাজ এবং কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছটা জেটি ঘাটে ট্যুরিস্ট পুলিশ তৎপর ছিল। যে কারণে কোনো পর্যটক হয়রানি কিংবা বিপদের সম্মুখীন হননি।