জীবনযাপন

শিশুদের বার্নআউট বুঝবেন কীভাবে

June 4, 2026
1 day ago
By SAJ
শিশুদের বার্নআউট বুঝবেন কীভাবে

‘বার্নআউট’ শব্দটা সম্ভবত সবচেয়ে খাপ খায় করপোরেট চাকরিজীবীদের সঙ্গে। কাজের চাপে পিষ্ট হয়ে অবিরাম ডেডলাইনের চাপে মানসিক চাপ ছাড়িয়ে যায় সহ্যের সীমা। তখনই ভেঙে পড়ে শরীর ও মন। সাধারণ কাজকর্ম করতেও তখন বিরক্ত লাগে, মানসিক অবসাদ মিলিয়ে শরীর আর চলতে চায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিই বার্নআউট।

অনেকেরই ধারণা, এ ধরনের বার্নআউট শুধু মাঝবয়সী চাকরিজীবীদেরই হতে পারে। কিন্তু তা নয়, বার্নআউট হানা দিতে পারে যেকোনো বয়সে। মূলত মানুষের মস্তিষ্ক যখন প্রতিদিনের কাজের চাপ একত্রে আর নিতে পারে না, তখনই চেপে বসে মানসিক অবসাদ। আর সেই অবসাদ থেকে শরীর ও মন দুটিই হাল ছেড়ে দেয়। এই অবসাদ যে শুধু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জমা হয়, তা নয়; বরং শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় বার্নআউটের বেশ কিছু লক্ষণ।

শিশুরা বার্নআউট হতে পারে বিভিন্ন কারণে। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষা, পারিপার্শ্বিক অবস্থান থেকে শুরু করে পরিবারের মানুষের চাপ। অনেক সময় একটা পরীক্ষার ফল ভালো না হওয়ার প্রভাবও পড়তে পারে অনেক বড় আকারে। তাই মানসিক চাপ ভালোভাবে মনে গেঁথে বসার আগেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

ঠিক এই জায়গায়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মা–বাবার ভূমিকা। কারণ, একটি শিশুকে খুব কাছ থেকে দেখেন তার মা-বাবা। সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন আর লক্ষণ দেখে সহজেই ধারণা করতে পারবেন, আপনার সন্তান বার্নআউট হয়ে যাচ্ছে কি না এবং তখন থেকেই দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে এই অবসাদ মনে আজীবনের মতো চেপে না বসে।

হঠাৎ করেই গড়িমসি করা

আগে হয়তো আপনার সন্তান স্কুল থেকে ফিরেই নিজে থেকে পড়তে বসে যেত, কিন্তু এখন তাকে পড়তে বসার কথা বারবার মনে করাতে হচ্ছে। বাসার পড়া তো পড়ছেই না, বইপত্রের মুখোমুখিই হতে চাচ্ছে না। নানা অজুহাতে পড়তে বসা পিছিয়ে দিচ্ছে। পড়াশোনার প্রতি অবসাদ, বার্নআউট থেকে এমনটা হতে পারে।

উদাসীন ভাব

হঠাৎ করেই সন্তানের মধ্যে সবকিছুর প্রতি একধরনের অনীহা বা উদাসীনতা দেখা দিতে পারে। আগে স্কুল থেকে ফিরেই প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আলোচনা করত, কথা বলত; কিন্তু হঠাৎ করেই এমন কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে সে। জিজ্ঞেস করলেও দুই এক শব্দের মধ্যেই কথা শেষ করতে চায়। হুট করে আগ্রহ কমে যেতে পারে বার্নআউট থেকে।

প্রিয় কাজে অনীহা

পড়াশোনার পাশাপাশি আগে যেসব কাজ করার জন্য উৎসুক ছিল, যেমন কোনো শখের কাজ বা খেলাধুলায় যেতে ভীষণ অনীহা দেখানো, নতুন নতুন বাহানা তৈরি করা হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ।

মনোযোগ হারিয়ে ফেলা

শিশুরা সাধারণত দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু হুট করেই যদি দেখেন তার মনোযোগ কমে গেছে, আগে টানা ২০-৩০ মিনিট মনোযোগ দিতে পারত, সে এখন ১০ মিনিটও স্থির থাকতে পারছে না; তাহলে সেটিও হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ। অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং শারীরিক ক্লান্তি থেকে মনোযোগ অনেক সময় কমে যায়।

খিটখিটে মেজাজ

বার্নআউটের অন্যতম লক্ষণ খিটখিটে মেজাজ। হুট করেন শিশুর হাসিখুশি চেহারা উবে যায়, আর মনমেজাজ হয় তিরিক্ষি। ছোটখাটো বিষয়ে রিঅ্যাক্ট করা হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ।

সন্তানকে জানুন

প্রতিটি শিশুর আচরণ, স্বভাব, মানসিক চাপ নেওয়ার ক্ষমতা আলাদা। সময়ের সঙ্গে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে এসব গড়ে ওঠে। কোন বিষয়গুলো আপনার সন্তানকে আনন্দ দিচ্ছে, কোন বিষয়গুলো তার মনে বিরক্তির উদ্রেক করছে—এসব বোঝার চেষ্টা করুন। সময় দিয়ে তাকে বিভিন্ন কাজে আগ্রহী করে তুলুন।

সন্তানকে পথ দেখান

সন্তান সুন্দর একটা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাক, তা কে না চান! কিন্তু সেই চাওয়া-পাওয়া সন্তানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। এমন চাপ থেকেও মানসিক অবসাদ আসে। সন্তানের ওপর আপনার চাওয়া-পাওয়া যে বাড়তি চাপ নয়, সেটি তার ছোট্ট মনে গেঁথে দিন।

সন্তানের কথা শুনুন

বেশির ভাগ সময়েই মা-বাবা সন্তানের কথার তেমন মূল্য দেন না; বরং নিজের কথাকেই বড় মনে করেন। তবে এই সময়ে শিশুদের মানসিক স্বস্তির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সে–ও যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝানো।

বিশ্রাম দিন

বেশির ভাগ বার্নআউটের পেছনে কারণ থাকে টানা কাজ করে যাওয়া। ক্লান্ত মন ও শরীরকে নতুন করে সতেজ করতে সবারই পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজন। পড়াশোনা দূরে রেখে তাকে একটু নিজের মতো সময় কাটাতে দিন। তার শরীর ও মনকে একটু আরাম করতে দিন।

স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করুন

ডিভাইস বা ফোনের স্ক্রিনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা শিশুদের মস্তিষ্ককে শান্ত করে না, উল্টো বার্নআউটের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই ডিভাইসের সামনে না বসিয়ে অফলাইন বা মাঠে খেলতে নিয়ে যান। এতে তারা যেমন শারীরিকভাবে অ্যাকটিভ হবে, তেমনই মানসিক চাপও অনেকটা ঝেড়ে ফেলতে পারবে।

চাপ মোকাবিলার কৌশল শেখান

মানসিক চাপ বা কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে বুদ্ধি দিয়ে সামলাতে হয়, তা সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই একটু একটু শেখান। পরীক্ষার সময়ের চাপ, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আবেগকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে কথা বলুন। মন খারাপ হলে বা চাপ অনুভব করলে তা নিয়ে কথা বলা, ডায়েরি লেখা বা খেলাধুলার অভ্যাস দারুণ উপকারে আসে।

সূত্র: চাইল্ড ফোকাস