বাংলাদেশ

সংকট কাটছে না, এলএনজির কার্গো নিয়ে অনিশ্চয়তা

August 18, 2026
1 day ago
By SAJ
সংকট কাটছে না, এলএনজির কার্গো নিয়ে অনিশ্চয়তা

দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কার্গোর ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে আগস্টে চারটি কার্গো আসার কথা। কিন্তু গতকাল সোমবার পর্যন্ত একটিও দেশে পৌঁছায়নি। কবে আসবে, সেটিও নিশ্চিত নয়। ফলে গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে আবার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শিগগিরই সংকট কাটার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

এ পরিস্থিতিতে জরুরি দরপত্রের মাধ্যমে আরও পাঁচ কার্গো এলএনজি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে দুটি কার্গোর জন্য দর পাওয়া গেলেও অন্য তিনটির জন্য কোনো কোম্পানি প্রস্তাব দেয়নি।

জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনে এলএনজি আমদানি তদারক করে পেট্রোবাংলা। আমদানির দায়িত্বে রয়েছে পেট্রোবাংলার কোম্পানি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। এলএনজি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা কার্গোগুলো না আসায় সংকট আরও বেড়েছে।

পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, মাসে সাধারণত ১০টি কার্গো আমদানি করা হয়। টার্মিনালে ত্রুটি থাকায় আগস্টে নয়টি কার্গো আসার কথা। এর মধ্যে তিনটি দরপত্রের মাধ্যমে, একটি দীর্ঘমেয়াদি ও একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় এবং চারটি সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা।

দরপত্রে কেনা তিনটি কার্গোর মধ্যে দুটি ইতিমধ্যে গ্যাস সরবরাহ করেছে। অন্যটি ২০ আগস্ট আসার কথা। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকেও একটি কার্গো পাওয়া গেছে। সৌদি আরামকোর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় একটি জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছেছিল। তবে স্থানান্তরে ঝুঁকি থাকায় ওই কার্গো থেকে এলএনজি নিতে রাজি হয়নি টার্মিনাল।

সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা চার কার্গোর দুটি সরবরাহ করার কথা হংকংভিত্তিক ঝেনইউ শিপিং কোম্পানির। গত রোববার তারা একটি জাহাজের তথ্য পাঠায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জাহাজটি যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। এটি গ্রহণ করলে পরবর্তী সময়ে অন্য জাহাজ ও আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের লেনদেনে জটিলতা দেখা দিতে পারে—এ আশঙ্কায় সরকার জাহাজটি নিতে রাজি হয়নি।

অন্য তিন কার্গোর সরবরাহের সময়ও এখনো নিশ্চিত করেনি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো। তারা সময় পিছিয়ে সেপ্টেম্বরে সরবরাহের অনুমতি চাইতে পারে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ক্রয়াদেশ পাওয়া সরবরাহকারীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি (ডকুমেন্টেশন) ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে পারেনি। তাদের জাহাজ না আসায় ইতিমধ্যে দরপত্র আহ্বান করে নতুন এলএনজি জাহাজ আনা হচ্ছে। সরবরাহ ধরে রাখা যাবে, কোনো সমস্যা হবে না।

আগস্টের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্ল্যাককিউব ইন্টারন্যাশনালের কাছ থেকে দুই কার্গো, ওমানভিত্তিক ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসির কাছ থেকে দুই কার্গো এবং হংকংভিত্তিক ঝেনইউ শিপিং কোম্পানির কাছ থেকে দুই কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত হয় সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে।

এর মধ্যে ব্ল্যাককিউবের একটি কার্গো আগস্টে ও একটি সেপ্টেম্বরে, ম্যাক্সওয়েলের একটি আগস্টে ও একটি অক্টোবরে এবং ঝেনইউর দুটি কার্গো আগস্টে সরবরাহ করার কথা।

আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, এক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ২০ ডলারের বেশি। গতকাল তা ছিল প্রায় ২২ ডলার। অথচ ব্ল্যাককিউব প্রতি ইউনিটের দাম দিয়েছে ১৫ দশমিক ৫০ ডলার ও ঝেনইউ ১৪ দশমিক ৯৫ ডলার।

এলএনজি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারদরের তুলনায় অনেক কম দামে সরবরাহের প্রস্তাব পাওয়ার পর কোম্পানি, কার্গোর উৎস ও প্রস্তাবিত জাহাজ সম্পর্কে আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা দরকার ছিল। এখন সরবরাহের সময় পিছিয়ে সেপ্টেম্বরে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলে বাজারদরের পরিবর্তনের কারণে সরবরাহকারী লাভবান হতে পারে। অথচ নির্ধারিত সময়ে সরবরাহে ব্যর্থ হলে চুক্তি অনুযায়ী তাদের জামানত থেকে অর্থ কেটে নেওয়ার কথা।

আগে জ্বালানি তেলের সংকটের সময়ও সরাসরি ক্রয়াদেশ পাওয়া কয়েকটি কোম্পানি তেল সরবরাহ করতে পারেনি। এরপরও নিয়মিত সরবরাহকারীদের মধ্যে দরপত্র না ডেকে নতুন কোম্পানিগুলোকে সরাসরি এলএনজি সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়।

সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা এলএনজির কার্গোগুলো অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় গতকাল জরুরি দরপত্র আহ্বান করা হয়। আগস্টে সরবরাহের জন্য তিনটি এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের জন্য দুটি, মোট পাঁচ কার্গো কেনার প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ২৩-২৪ আগস্ট ও আগামী ৪-৫ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য দুই কার্গোর দর পাওয়া গেছে। দুটিতেই সর্বনিম্ন দরদাতা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম; দর প্রতি ইউনিট প্রায় ২২ ডলার। অন্য তিন কার্গোর জন্য কোনো কোম্পানি দর দেয়নি। সেগুলোর জন্য আবার দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে।

বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং খোলাবাজার—এই দুই উৎস থেকে এলএনজি আমদানি করে। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশ থেকে নিয়মিত সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তারা মাঝেমধ্যে এক বা দুই কার্গো পাঠাচ্ছে।

সৌদি আরামকোর সঙ্গে জিটুজি (সরকারি পর্যায়ে) ভিত্তিতে একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তিও রয়েছে। এ ছাড়া পেট্রোবাংলার তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে দরপত্র ডেকে খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনা হয়। বর্তমান সরকার তালিকা হালনাগাদ করে ২৯টি কোম্পানির নাম চূড়ান্ত করেছে।

কক্সবাজারের মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ৬০ কোটি এবং দেশি কোম্পানি সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট।

গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। টানা ২৫ দিনের তীব্র সংকটের পর গত শনিবার সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে সরবরাহ বাড়ে। তবে নতুন কার্গো না থাকায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে দুই দিন ধরে সরবরাহ কমছে। নতুন জাহাজ না এলে এ টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

গত শুক্রবার বিকেলে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে দৈনিক ১৬৪ কোটি ঘনফুটে। শনিবার রাতে তা বেড়ে ২৪২ কোটি ঘনফুট হয়। রোববার সরবরাহ কমে ২৪০ কোটি এবং গতকাল ২২৮ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। গতকাল এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয় ৬৬ কোটি ঘনফুট।

শনিবারের পর গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ায় নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও হবিগঞ্জের কয়েকটি কারখানা রোববার উৎপাদনে ফিরতে শুরু করে। তবে সব এলাকায় পরিস্থিতি সমান নয়।

দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী এসিআই লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাসের সরবরাহ আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। এখন উৎপাদন মোটামুটি ঠিক আছে।

নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, নরসিংদীতেও সরবরাহ বেড়েছে। যদিও গাজীপুরের কিছু এলাকায় সংকট রয়ে গেছে।

অন্যদিকে সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলসে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। লিটল স্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে আমাদের কারখানায় দিনে গ্যাসের চাপ থাকে ৫ পিএসআই, রাতে ১০ পিএসআই। কিন্তু গতকাল প্রয়োজনীয় চাপ পাওয়া যায়নি।’

জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, সরাসরি কেনার উদ্দেশ্যই হলো দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা। সংকটের সময় সরবরাহ দিতে না পারলে সরাসরি কেনার কোনো অর্থ থাকে না। যারা ব্যর্থ হয়েছে, তাদের সময় বাড়ানোর সুযোগ নেই। জামানত বাজেয়াপ্ত করে তাদের কালোতালিকাভুক্ত করা উচিত। এখন দ্রুত দরপত্রের মাধ্যমে এলএনজির ব্যবস্থা করতে হবে। বেশি দাম হলেও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার।