বাংলাদেশ

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ছড়ানো হচ্ছে পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও

October 20, 2026
11 hours ago
By SAJ
সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ছড়ানো হচ্ছে পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও

পথচারীদের রাস্তা পারাপার হওয়া জেব্রা ক্রসিংয়ের নিকটে কালো রঙের বোরকা পরা এক নারীকে ঘিরে আছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য। তাঁর মধ্যে একজন সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তি হাতে তলোয়ার নিয়ে আছেন।

ঘেরাওয়ের মধ্যে কালো পোশাক পরা ওই নারীকে আরবি ভাষায় বলতে শোনা যায়, ‘আমি হত্যা করিনি। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আমি হত্যা করিনি।’ তিনি আরও চিৎকার করে বলেন, ‘হারাম। হারাম। হারাম। হারাম। আমি হত্যা করিনি...আমি তোমাদের ক্ষমা করব না...এটা অবিচার।’

সাদা পোশাক পরা ব্যক্তি তাঁকে মাটিতে শুইয়ে দেন। ঘটনাস্থল পথচারীদের পারাপারের একটি চিহ্নের কাছে। দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। ওই নারী বলতে থাকেন, ‘আমি করিনি।’ এরপর তাঁর শেষ চিৎকার শোনা যায়। সাদা পোশাক পরিহিত বাঁকানো তলোয়ার দিয়ে তাঁর শিরশ্ছেদ করেন।

১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি সম্প্রতি ওই দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নয়। এটি ২০১৫ সালে সৌদি আরবে এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরোনো ভিডিও। ওই নারী নিজের সৎকন্যাকে যৌন নিপীড়ন ও হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।

১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর জানায়। পরদিন ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি কূটনৈতিক পত্র দিয়েছিল।

এরপর ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে এই কূটনৈতিক পত্র পুনরায় দেওয়া হয়। সাখাওয়াত হোসেন বৈঠক ও আরেকটি কূটনৈতিক পত্র দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রথম আলোকে। তবে আলোচনার বিস্তারিত জানাতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, জেদ্দার আলোচনায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল প্রশ্ন তোলেন, নিয়মিত পাঠানো বন্দিতালিকায় দুজনের নাম থাকলেও শাস্তির তথ্য কেন উহ্য রাখা হলো।

নতুন করে দেওয়া কূটনৈতিক পত্রের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির মামলার বিস্তারিত বিবরণ, বিচারিক প্রক্রিয়ার সময় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ আর দণ্ডিত হওয়ার পর তাঁরা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ আদৌ পেয়েছিলেন কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

ঢাকার কর্মকর্তারা জানান, গতকাল জেদ্দার আলোচনার সময় যত দ্রুত সম্ভব দণ্ডিত দুই বাংলাদেশির বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ জানানো হয়। বৈঠকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রথমে নিম্ন আদালত দুই আসামির দণ্ড দেন। পরে আপিল আদালতে ১৩ জন বিচারক নিয়ে গঠিত প্যানেল তাঁদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। আদালতের রায় অনুসরণ করে নারী ও পুরুষের জন্য নির্ধারিত পৃথক সেলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ভিডিওটি ২০১৫ সালের

আলোচিত ভিডিওর কয়েকটি স্থিরচিত্র নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে যুক্তরাজ্যের মিডল ইস্ট আই ও ডেইলি মেইল, ইসরায়েলের টাইমস অব ইসরায়েল ও পাকিস্তানের ডন-এর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

সৌদি আরবের সরকারি সংবাদ সংস্থা ও দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, শিরশ্ছেদ করা ওই নারীর নাম লায়লা বিনতে আবদুল মুত্তালিব বাসিম। তিনি মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন ও সৌদি আরবে বসবাস করতেন।

সৌদি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, ওই নারী তাঁর স্বামীর ছয় বছর বয়সী মেয়েকে নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের পর হত্যা করেছিলেন। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অর্থাৎ দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি করে ২০১৫ সালের পুরোনো ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।

মরদেহ দেশে ফেরার দাবিও অসত্য

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের ভুল তথ্যও ছড়িয়ে পড়ছে। এর ধারাবাহিকতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক প্ল্যাটফর্ম ও সংবাদমাধ্যমের অনলাইন পেজে বিমানবন্দরে কফিন বহন করে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, ‘সৌদি আরব থেকে দেশে আনা হলো নজরুল আর সিতির (সুইটি আক্তার) দেহ।’

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফেরার দাবিটি সঠিক নয়। সৌদিপ্রবাসী অন্য এক ব্যক্তির মরদেহবাহী কফিনের ভিডিওকে তাঁদের মরদেহ দেশে আসার বলে প্রচার করা হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক (কল্যাণ) ও অফিসপ্রধান শরিফুল ইসলামের সঙ্গে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটে যোগাযোগ করা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘লাশ এখনো আসেনি।’

স্বামী-স্ত্রী ও ওমরাহ-দাবির সত্যতা নেই

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও পুরুষের ছবি দিয়ে তৈরি আরেকটি ফটোকার্ড ছড়িয়েছে। এতে দাবি করা হচ্ছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। তাঁরা হানিমুনের পরিবর্তে ওমরাহ করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁরা স্বামী-স্ত্রী ছিলেন—এমন কোনো তথ্য কোনো সংবাদমাধ্যমেপাওয়া যায়নি।

নজরুল ইসলামের বাবা আবদুল বাছির আলো প্রথম আলোকে বলেন, ‘নজরুল অবিবাহিত ছিল। তার সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়েটি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।’

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নজরুল ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান। মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় দেশটির পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এর পর থেকে সৌদি আরবের কারাগারে ছিলেন।

গ্রেপ্তারের এক মাস পর পরিবার তাঁর আটকের খবর জানতে পারে। মাঝেমধ্যে মা–বাবার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। তাঁদের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয় ১১ অক্টোবর। সেদিন দুই থেকে আড়াই মিনিট কথা হয়। এরপর গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে একজন ফোন করে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি পরিবারকে জানান।

অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রী ছিলেন ও ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব দাবিরও সত্যতা পাওয়া যায়নি।

নজরুলের বাবা আবদুল বাছির প্রথম আলোকে বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। প্রথম সাত-আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। এরপর তিন বছর ধরে কারাগারে ছিল। আবদুল বাছির বলেন, ‘আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’

নজরুলের মা রহিমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলত। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হইছে, তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো আমার ছেলের লাশ দেখতে চাই।’

অন্য প্রবাসীর মরদেহের ছবি প্রচার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি ফটোকার্ডে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে কয়েকজনকে কাঁধে কফিন বহন করতে দেখা যায়। ছবিটির সঙ্গে ‘সৌদি আরব থেকে দেশে আনা হলো নজরুল আর সিতির দেহ’ শিরোনাম যুক্ত করা হয়েছে।

ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে চলতি বছরের ৯ মে প্রকাশিত ‘সৌদি আরবে নিহত মুরাদের মরদেহ ১৬ দিন পর নিজ বাড়িতে’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে একই ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার প্রবাসী মুরাদ শেখের মরদেহ ১৬ দিন পর দেশে পৌঁছায়। ৯ মে সকালে মরদেহটি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। ওই দিন বেলা ১১টায় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

অর্থাৎ সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত প্রবাসী মুরাদ শেখের মরদেহ দেশে আনার সময়ের ছবিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফেরার ছবি বলে প্রচার করা হচ্ছে।