তদন্তাধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে ফেরাল কারা অধিদপ্তর, কী বার্তা দিচ্ছে
নানা অভিযোগে তদন্তের মুখে থাকা ২৫ কর্মকর্তা–কর্মচারীকে কাজে ফিরিয়েছে কারা অধিদপ্তর। তাঁরা সবাই সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। তাঁদের দায়িত্বে পুনর্বহালের ক্ষেত্রে কর্মী–সংকটকে যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া সার্বিকভাবে ভুল বার্তা দিচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
গত ৯ মার্চ সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাজে যোগদান করাতে ভিন্ন ভিন্ন চিঠিতে সব জেল সুপারকে চিঠি পাঠানো হয় কারা অধিদপ্তর থেকে।
এই ২৫ জনের মধ্যে ২২ জন কারারক্ষী। কর্মকর্তা দুজন হলেন—সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক ডেপুটি জেলার মো. মনিরুল হাসান ও ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক ডেপুটি জেলার মো. ইমতিয়াজ জাকারিয়া। এ ছাড়া রাঙামাটি জেলা কারাগারের গাড়িচালক মো. বনি ইসরাইলকেও কাজে পুনর্বহাল করতে বলা হয়েছে।
নানা ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সেই কারণে তাঁরা সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় ছিলেন।
পুনর্বহালের যে যুক্তি
তাঁদের নিয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, কারাগারগুলোতে বিভিন্ন অপরাধে কারা কর্মচারীরা সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন। তাঁরা কর্মে না থাকায় দপ্তর ও কারাগারসমূহে ডিউটি–সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কারাগারে স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
এর সঙ্গে বলা হয়েছে, সাময়িক বরখাস্ত থাকাকালীন তাঁদের খোরাকি ভাতা বাবদ সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অথচ তাঁদের কর্মদক্ষতা থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে, যা সরকারের আর্থিক ক্ষতি।
এই কারণে এই ২৫ জনকে কাজে যোগদান করানোর অনুরোধ জানিয়ে চিঠিগুলো পাঠান কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার তিন ব্যক্তি হত্যা মামলায় ২৩ জানুয়ারি গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে ময়মনসিংহ কারাগারে ছিলেন। জামিন না হলেও ২৭ জানুয়ারি কারাগার থেকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর ২৯ জানুয়ারি রাতে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করে র্যাব।
এরপর ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার ইমতিয়াজ জাকারিয়াকে গত ২৯ জানুয়ারি দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর ৪ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ইমতিয়াজ জাকারিয়াকে পুনর্বহালের আদেশ জারি করেছেন কারা মহাপরিদর্শক। তাঁকে সিলেটে বদলি করা হয়েছে।
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২–এর ডেপুটি জেলার মনিরুল হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করে একটি হোটেলে এক নারীকে নিয়ে তাঁর থাকার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল বরখাস্তের ওই আদেশে। পরে ১৪ ডিসেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়।
রাঙামাটি জেলা কারাগারের গাড়িচালক বনি ইসরাইলও দায়িত্ব-কর্তব্য অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগে গত ৮ ডিসেম্বর সাময়িক বরখাস্ত হন।
২২ জন কারারক্ষী নানা অপরাধে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। তাঁদের বরখাস্তের তারিখগুলো ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, গাজীপুর জেলা কারাগার, মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগার, গোপালগঞ্জ জেলা কারাগার, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার, বান্দরবান জেলা কারাগারে কর্মরত ছিলেন তাঁরা।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোতাহের হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলনামূলকভাবে কম, তাদের কর্মস্থলে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ২৫ জন ছাড়াও ৩০ থেকে ৩৫ জন সাময়িক বরখাস্ত হয়ে আছে।
এদের পুনর্বহালের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা বসে বসে সরকারের বেতন নিচ্ছে। তাই লোকবল–সংকট বিবেচনায় তাঁদের কাজে লাগানো হয়েছে।’
তবে তদন্তপ্রক্রিয়া চলবে জানিয়ে কারাপ্রধান বলেন, ‘এর মানে এই নয় যে তাদের চাকরি যাবে না বা বিষয়টি শেষ হয়ে গেছে। তদন্ত শেষে তারা বিভাগীয় শাস্তি পেতে পারে।’
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রাথমিক তদন্ত ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে জানিয়ে কারাপ্রধান বলেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ করতে সময় লাগবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাময়িক বরখাস্ত করা মানে হলো একটি সংস্থা বা প্রশাসনিক বিভাগে তদন্ত চলাকালীন ওই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা, যাতে তদন্তে কোনো প্রভাব না পড়ে। কিন্তু তদন্ত চলাকালীন তাঁদের পুনর্বহাল করায় বরখাস্তের আদেশের প্রধান উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, তদন্ত শেষে নির্দোষ প্রমাণিত হলে পুনর্বহাল হওয়া স্বাভাবিক। তবে তদন্ত শেষ না হলে বা শাস্তি কার্যকর না হলে পুনর্বহাল হওয়া নিয়মের পরিকাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এ বিষয়ে চাকরির বিধান নিয়ে অসংখ্য বইয়ের লেখক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা ও ফাঁকের সুযোগ নিয়ে এমনটি করা হয়। কিন্তু অনৈতিক ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাজে পুনর্বহাল করা উচিত না, যত জনবল সংকট থাকুক।
‘তাহলে এই সুযোগ নিয়ে আরও অপকর্ম করবে। এতে জনমনেও ভুল বার্তা যাবে,’ বলেন ফিরোজ মিয়া।