বাংলাদেশ

টরকী বন্দরের টিকে থাকার লড়াই

May 19, 2026
2 weeks ago
By SAJ
টরকী বন্দরের টিকে থাকার লড়াই

পালরদী নদীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হিমশীতল বাতাসে ভোরের আলো যখন প্রথম উঁকি দেয়, তখন থেকেই কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকী বন্দর। একসময় বড় বড় গয়না নৌকা আর ব্রিটিশ আমলের ধোঁয়া ওঠা স্টিমারের সাইরেনে মুখর থাকত এই জনপদ। আজ সেই স্টিমার নেই, পাল তোলা নৌকার বদলে এসেছে যান্ত্রিক ট্রলার। কিন্তু টরকীর সেই আদি ও অকৃত্রিম বাণিজ্যের ঘ্রাণ আজও ফিকে হয়নি।

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ধান-চাল, বাদাম, ডাল, মরিচ, পান, পাট আর গুড়-নারকেলের গন্ধে ম-ম করা এই বন্দর এখনো দক্ষিণবঙ্গের অর্থনীতির এক অদৃশ্য চাবিকাঠি। তবে সময়ের আবর্তে নদী ছোট হয়ে এলেও ঐতিহ্যের পাল ধরে আজও টিকে আছে এই প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র, যা কেবল একটি বাজার নয়—বরং হাজারো ব্যবসায়ীর পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি আর শত বছরের লড়াইয়ের এক জীবন্ত দলিল।

বরিশালের প্রবেশদ্বার

ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের টরকী বাসস্ট্যান্ডে নেমে পূর্ব দিকে এগোলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পালরদী নদীর তীরে সারি সারি টিনের ঘর। তার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে পুরোনো দিনের পাকা দালান। ঢাকা বিভাগের মাদারীপুর জেলা পার হতেই বরিশাল অঞ্চলের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত এই বন্দরটি একসময় দক্ষিণবঙ্গের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল। বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় অবস্থিত এ বন্দরে এখনো বণিক সমিতির সদস্য তিন শতাধিক এবং অস্থায়ী ও অন্যান্যসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাজারের বেশি। সম্প্রতি এক সাপ্তাহিক হাটের দিনে সকালবেলায় বন্দরের সরু গলিপথ ধরে হাঁটতেই দেখা মেলে হাজার হাজার শ্রমিক ও দোকানিদের কর্মব্যস্ততা। বেলা গড়াতে স্থায়ী দোকানগুলোতে যেমন বেচাকেনা জমে ওঠে, তেমনি হাঁকডাকে চাঙা হয় অস্থায়ী টংদোকানগুলোও।

এই গলি ওই গলি ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখা হলো ৭৫ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যবসায়ী কামাল মিঞার সঙ্গে। তাঁর চোখে এখনো পুরোনো দিনের সেই সতেজতা। ৩৫ বছর ধরে তিনি এই বাজারে ফসলের বীজ বিক্রি করছেন। কয়েকটা চটের বস্তা সামনে রেখে বসে আছেন একটি ছোট একচালা দোকানে, ভেতরে নানা জাতের শস্যবীজ।

কামাল মিঞা স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘একসময় আমার দোকানের সামনে বস্তাভর্তি দেশি শস্যবীজের স্তূপ থাকত। এখন সেখানে বহুজাতিক কোম্পানির প্যাকেটজাত হাইব্রিড বীজ আর রাসায়নিক সারের রাজত্ব।’ তাঁর কথায় উঠে আসে কৃষি অর্থনীতির বদলে যাওয়ার গল্প। আগে কৃষকেরা বীজ বিনিময় করতেন, এখন তাঁদের নির্ভর করতে হয় বাজারের ওপর। সেই বীজগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এই মাটির নিজস্ব চরিত্র। কিন্তু গত দুই-তিন দশকে উচ্চফলনশীল জাতের (উফশী) বিস্তারে সেই কৃষি অর্থনীতি পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রান্তিক কৃষক এখন আর নিজেরা তেমনটা বীজ সংরক্ষণ করেন না, বিভিন্ন কোম্পানির বীজই তাঁদের ভরসা। কামাল মিঞার ভাষায়, ‘আগে চালে ঘ্রাণ ছিল, পুষ্টি ছিল। এখন ফলন ডাবল হয় ঠিকই, কিন্তু সেই স্বাদ কই?’

একসময় এখানে সারি সারি বীজের দোকান ছিল। এখন সেখানে আছে সারি সারি চাল, ডাল আর পেঁয়াজ-রসুনের পাইকারি দোকান। কারণ, ব্যবসার ধারা বদলেছে। এখানকার পাইকারি দোকানের পণ্য চলে যাচ্ছে বরিশাল অঞ্চলের নানা প্রান্তে। জানালেন এই প্রবীণ ব্যবসায়ী। তাঁর সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী টরকী নিয়ে আলাপ হয় গত ১০ মার্চ। শুধু কামাল মিঞা নন, আরও অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপে উঠে এসেছে এই বাজারের অতীত–বর্তমান চিত্র।

মরে যাওয়া নদী ও বদলে যাওয়া ব্যবসার মানচিত্র

কামাল মিঞার মতো প্রবীণ ব্যাবসায়ী এই বাজারে আছেন মাত্র কয়েকজন। তাঁদের স্মৃতির বর্ণনায় এই বাজারের মানচিত্রের একটা ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর দোকানের সামনে দিয়ে যে চাল-ডালের পাইকারি গলি চলে গেছে, ৩০ বছর আগেও সেখানে ছিল খরস্রোতা এক খাল। একটু সামনেই ছিল স্টিমার ঘাট। সেই ঘাটের কাছেই এখন ‘ভাই ভাই বাণিজ্যলয়’। এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. ইদ্রিস আলি পাইকারি পেঁয়াজ, রসুন ও আদা বিক্রি করেন। তিনি জানান, এই আড়তগুলোর ওপর ভিত্তি করেই এখনকার বাণিজ্য টিকে আছে। একসময় ধানডোবা, রাজাপুর বা চেঙ্গুটিয়া থেকে চাষিরা গয়না নৌকায় করে ধান–চাল নিয়ে আসতেন। আসত নৌকাবোঝাই বিভিন্ন জাতের পাট। ইদ্রিস আলির কণ্ঠেও পুরোনো দিনের সেই মুখরতার রেশ পাওয়া যায়।

ইদ্রিস আলি ছোটবেলায় এই বন্দরে প্রতি হাটবারে ধনেপাতা বিক্রি করতেন। তখন নৌকায় করে আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও শুকনা মরিচ নিয়ে বিভিন্ন এলাকার বণিকেরা হাটবারের আগের রাতেই আসতেন, ভোর থেকে পণ্য বিক্রি শুরু করে থাকতেন বিকেল পর্যন্ত। আবার বিক্রি শেষে যে যাঁর গন্তব্যে চলে যেতেন। তবে অনেক বছর থেকে নৌকায় তেমন পণ্য আসে না। অন্য অঞ্চলের বণিকেরা এখন আসেন সড়কপথে। তিনি জানান, অন্যান্য বড় বাজারের মতো এখানেও পাইকারি নিত্যপ্রয়োজনীয় মালের আড়ত ও খুচরা দোকানের ওপর বাণিজ্য টিকে আছে। তাঁর আড়তের পেছন দিয়ে একসময় টরকী-বাশাইল খাল বয়ে যেত। এখন খালটির অবস্থান আরও দুই সারি দোকান পার হয়ে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, এই বাজারে গয়না নৌকায় করে কাউন, তিসি, তুলা, ভোজ্যতেল ও লবণ নিয়ে আসতেন ব্যবসায়ীরা। আরও ছিল গোবিন্দভোগ, বালাম, রূপশালী, সাক্করখানি, বাঁশফুল, দুধেশ্বর, খেজুরছড়ি, বউআড়ি ও কমলা ভোগ ধান এবং তোষা, সাদা, দিয়াড়া বা দাওড়া, বক্রাবাদি ও মেস্তার মতো নানা জাতের পাট। এ বাজারে পিঠা-পুলি ও মুড়ির জন্য আলাদা চাল বিক্রি হতো। এখন আর সেগুলো কেউ খোঁজেও না, চাষও হয় না। এখন গয়না নৌকার বদলে আছে কিছু ইঞ্জিনের ট্রলার। তবে বেশির ভাগ পণ্য পরিবহন হয় সড়কপথে।

রেঙ্গুন থেকে কলকাতা: কদর ছিল টরকীর সুপারি

কথিত আছে, আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা পালরদী নদীর পানির বর্ণ ‘গৌর’ বা সোনালি হওয়ার কারণে এই অঞ্চলের নাম হয়েছিল গৌরনদী। আর এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল টরকী বন্দর। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে সুপারি, ধান ও পাটের বৃহৎ বাজার হিসেবে এর খ্যাতি ছিল এশিয়াজুড়ে। দক্ষিণবঙ্গের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই বন্দরে একসময় স্টিমার আর বড় বড় গয়না নৌকায় পণ্য আসত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে।

তখন টরকী বন্দরে ঢুকতেই চোখে পড়ত সারি সারি সুতা আর তাঁতের কাপড়ের দোকান। সময়ের অমোঘ নিয়মে সেই চিত্র এখন আমূল বদলে গেছে। যেখানে একসময় তাঁতিদের কোলাহল ছিল, সেখানে এখন বসেছে পান-সুপারি, মাছ আর মুরগির বাজার। এই বদলে যাওয়া সময়ের সাক্ষী ৮০ বছর বয়সী শহিদ কাজী। একসময় রেল বিভাগে চাকরি করলেও ৬০ বছর ধরে এই হাটেই ব্যবসা করছেন তিনি।

শহিদ কাজীর স্মৃতিচারণায় উঠে এল টরকীর বাণিজ্যের এক বৈশ্বিক আখ্যান। তিনি জানান, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে এই বন্দরের মজা সুপারির খ্যাতি ছিল সুদূর বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) রেঙ্গুন পর্যন্ত।

গৃহস্থদের কাছ থেকে সুপারি সংগ্রহ করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পানিতে ভিজিয়ে বা কলসী ভরে মাটিতে পুঁতে পচানো হতো। এই কড়া স্বাদের পচা সুপারি বা ‘মজা সুপারি’ ছিল রেঙ্গুনের মানুষের ভীষণ প্রিয়। বড় বড় গয়না নৌকা বা কার্গো জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে এই সুপারি চলে যেত সরাসরি রেঙ্গুনে।

হারিয়ে গেছে তাঁতশিল্প

জেলা গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র টরকী বন্দর ঘিরে জমজমাট ছিল কাপড়ের ব্যবসা। ১৯৬১ সালে টরকী বন্দরে স্থাপিত হাওলাদা টেক্সটাইল মিলে ২ হাজার ৮৯৬টি শাড়ি বছরে উৎপাদন করতে ব্যয় হতো ৮৭ হাজার ৭৬৭ টাকা। প্রতিটি শাড়ির উৎপাদন ব্যয় ছিল ৩০ টাকা। এ অঞ্চলে তাঁতিদের জন্য ১৯৬৬ সালে সর্বজনীন সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পরে এ অঞ্চলে তাঁতের প্রসার ঘটে। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে গৌরনদীতে ৪৫ হাজার ৫৫০টি তাঁত ছিল, তবে এখন যা নামমাত্র।

বরিশালের তাঁত ঐতিহ্যে মূল ছিল টরকী তাঁতশিল্প। গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ার গ্রামগুলোতে হস্তচালিত তাঁতে বোনা গামছা, লুঙ্গি, ওড়না আর শাড়ির সুতা আসত এই বন্দর দিয়ে। তাঁতিদের তৈরি পোশাক যেত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। শহিদ কাজী আক্ষেপ করে বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে কারখানায় তৈরি কাপড়ের দাপটে আমাদের সেই দেশি তাঁত হারিয়ে গেছে। এখন সেই পুরোনো দোকানগুলোর জায়গায় গড়ে উঠেছে আধুনিক রেডিমেড পোশাকের মার্কেট। তাঁতের খটখট শব্দ না থাকলেও ঈদ বা পূজায় এই পুরোনো ব্যবসাকেন্দ্রটি এখনো তার চিরাচরিত ব্যস্ততায় প্রাণ ফিরে পায়।

যন্ত্রনির্ভর কাঠের ব্যবসা

টরকী লঞ্চ টার্মিনালের ঠিক সামনে এখন করাতকলের তীক্ষ্ণ ‘ক্যাঁ...ক্যাঁ’ শব্দ আর কাঠের গুঁড়ার ওড়াউড়ি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে চলে পাল্লা-কাঠামো তৈরির রমরমা কারবার। ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম আর মিস্ত্রিদের মাপজোখের ব্যস্ততা। কিন্তু ‘বোস এন্টারপ্রাইজ’-এর হিলটন বোসের চোখে এই দৃশ্যটা একদম অন্য রকম। তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, যেখানে এখন করাতকলের কর্কশ শব্দ, সেখানেই একসময় বসত টরকীর সবচেয়ে প্রাণবন্ত পানের হাট। দেশের দূরদূরান্ত থেকে পাইকারেরা আসতেন, মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকত না। পানের হাটটি মহাসড়কের কাছে সরে যাওয়ার পর থেকেই যেন এই প্রাচীন বন্দরের আসল রূপ হারিয়ে যাচ্ছে।

চালের মহাজনি আখ্যান

চালের পুরোনো ব্যবসায়ী জয়নাল সরদার আজও হাটে বসেন, কিন্তু তাঁর চোখ খোঁজে সেই বড় বড় ‘বালার’ ও ‘পানসি’ নৌকাগুলো। তখনকার খরস্রোতা নদীতে প্রতিটি হাটে তাঁর আড়তেই চার-পাঁচটি পানসি নৌকা ভিড়ত, যার একেকটিতে দেড়–দুই হাজার মণ চাল আসত।

প্রবীণ ব্যবসায়ী গৌতম বণিকের স্মৃতিতে আজও ভাসে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চল থেকে আসা ‘বাতানাই’ বা ‘মালার’ নামক বিশাল সব মহাজনি নৌকা। চার থেকে সাড়ে চার হাজার মণ পণ্য নিয়ে নদীর বুকে ভাসমান পাহাড়ের মতো দুলত সেই নৌকাগুলো। আজ সেই পালরদী নদীর নাব্যতা নেই, নেই সেই মহাজনি নৌকার রাজত্বও। সেই পাল তোলা পাহাড়সমান নৌকাগুলো জাদুঘরের অংশ।

পাটের গদি ও লবণের আধিপত্য

লঞ্চ টার্মিনাল থেকে নদী ধরে একটু এগোলেই চোখে পড়ত পাটের সেই বিশাল মোকামগুলো, এখন তা নেই। ব্রিটিশ আমলে এখানে ডান্ডি আর কলকাতার জুট মিলগুলোর প্রতিনিধিদের আনাগোনায় মুখর ছিল। দেশভাগের পর লবণের বাজারেও ছিল টরকীর একচ্ছত্র আধিপত্য। চট্টগ্রাম থেকে আসা পাহাড়সমান লবণের স্তূপ এখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ত বরিশাল, মাদারীপুর ও ফরিদপুরের ঘরে ঘরে। সেই সোনালি সময়ে রায়, সাহা ও কুণ্ডু পরিবারের ব্যবসায়িক দাপট ছিল প্রবাদপ্রতিম। সুপারি, পাট আর লবণ—একসময়ের সেই বিশাল তিন স্তম্ভ এখন নেহাতই মৌসুমি বাণিজ্যে টিকে আছে।

হারিয়ে যাচ্ছে দেশি আখের মিষ্টত্ব

সাপ্তাহিক হাটের দিনে টরকীর বাতাসে একসময় ভেসে বেড়াত আখ ও খেজুরের গুড়ের মনমাতানো ঘ্রাণ। ‘রাহুল স্টোর’-এর স্বপন সাহার আড়তে আজও গুড়ের বস্তা আসে, কিন্তু সেই আগের কোলাহল নেই। ৮-১০ জন সুঠাম শ্রমিকের জায়গায় আজ ঝিমিয়ে বসে থাকেন মাত্র একজন শ্রমিক। স্বপন সাহার আক্ষেপের সুর আরও চড়া, ‘দেশি জাতের আখের চাষ কমে যাওয়ায় আগের সেই সুঘ্রাণ আর নেই। হাইব্রিড আখে ফলন হয়তো বেশি, কিন্তু মিষ্টত্ব তলানিতে।’

ব্যবসার পালাবদল

হাটের মোড়ে এখন দু-চারটি ভাতের হোটেল। দুপুরের দিকে কিছুটা ভিড় বাড়ে, তবে তাঁরা সবাই নিয়মিত ব্যবসায়ী। বাইরের মানুষ এখন আর এখানে ভাত খেতে আসেন না। স্থানীয় বাসিন্দা হোসেন মনার স্মৃতিতে এই শূন্য টেবিলগুলোর জায়গায় ভেসে ওঠে ২০টির বেশি জ্বলন্ত উনুনের সারি। হোসেন মনা একসময় এখানকার এক হোটেলের কর্মচারী ছিলেন।

‘হাটের আগের রাত থেকে ভোর পর্যন্ত মানুষের ঢল নামত। আমাদের এক দোকানেই দিনে তিন-চার মণ চাল চলত। ১২ জন কর্মচারী মিলেও কুলাতে পারতাম না। খাওয়াতে খাওয়াতে এমন অবস্থা হতো যে এক দিন বিশ্রাম না নিলে গায়ের ব্যথা কমত না।’

প্লাস্টিকের ভিড়ে ব্যবসা হারাচ্ছে পালপাড়া ও বাঁশশিল্প

হাটের গলিগুলোতে এখন প্লাস্টিকের বালতি, মগ আর থালার স্তূপ। অথচ কার্তিক শীল এই স্তূপের আড়ালে দেখতে পান ৪০ ঘর পাল পরিবারের সেই রঙিন মাটির হাঁড়ি-পাতিলের হাট। আজ টিকে আছে মাত্র সাতটি পরিবার। একই বিষণ্নতা বাঁশ ব্যবসায়ী সুনীল চন্দ্র মজুমদারের চোখেও। আগে ১২ জন মিলে যেখানে কুলা, ধামা, চাঁই আর পলো বিক্রি করতেন, সেখানে আজ তিনি একা বসে থাকেন। প্লাস্টিক আর কারেন্ট জালের দাপটে গ্রামীণ এসব পণ্যের ক্রেতা খুঁজে পাওয়াই এখন দায়।

প্রাকৃতিক সাবান: খইল মাটি যেন রূপকথা

একসময় টরকী বন্দরের অত্যন্ত পরিচিত পণ্য ছিল ‘খইল মাটি’ বা মাটির সাবান। নদীর পাড়ের নির্দিষ্ট একটি স্তর থেকে সংগ্রহ করা এই মাটি নৌকায় করে আসত চাঙর হিসেবে। হাটে বিক্রি হতো মণ দরে। এই মাটি ঘষলে হালকা ফেনা হতো। নদীর ঘাটে হাজারো কুলি-মজুর ও মাঝিমাল্লাদের ঘামঝরানো শরীরের প্রধান প্রশান্তি ছিল এই প্রাকৃতিক সাবান। আজ সেই খইল মাটিও নেই, নদীর ঘাটে সেই হাজারো শ্রমিকের কোলাহলও নেই।

মাটির সাবানের পাশাপাশি ১৯৬৩ সালে টরকীতে স্থাপিত হয় সিরাজ সোপ ফ্যাক্টরি। সাবানের এই কারখানায় বছরে প্রায় পাঁচ হাজার মণ সাবান বিক্রি হতো। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়েও এখান থেকে বছরে সাড়ে ৯ লাখ টাকার সাবান উৎপাদন হয়েছে।

পাটের মৌসুমে এখনো কিছু ফড়িয়া ও পাইকারের আনাগোনা দেখা যায়। মৌসুম শেষে পাটের আড়ত অন্য ব্যবসার কাজে ব্যবহার হয়। কামারপট্টিতে শঙ্কর চন্দ্র কর্মকারের দোকানে কৃষি যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ চললেও অর্ডার কমেছে। ‘মেসার্স কুণ্ডু ট্রেডার্স’-এর বিমল চন্দ্র কুণ্ডু জানান, আগে এই এলাকায় সাতটি তেলের মিল ছিল, কিন্তু এখন কেবল ‘লিচু মার্কা’ শর্ষের তেলের মিলটিই টিকে আছে।

কসবা গরুর হাট: উপকথা ও বাস্তবতা

টরকীর ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে এক অলৌকিক দিঘির উপকথা। যেখানে এখন কসবা গরুর হাট, সেখানেই ছিল এক বিশাল দিঘি। লোকমুখে ফেরে, আগে উৎসবে পিতল-কাঁসার থালা–বাসন চাইলে দিঘির ঘাটে তা ভেসে উঠত। কিন্তু এক গ্রামবাসীর লোভের বশে একটি থালা চুরি হওয়ায় সেই অলৌকিক প্রথা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেই দিঘিটিও শুকিয়ে যায়।

মরা দিঘির বুকেই এখন বসে কসবা গরুর হাট। হাটের দিনে কিছু গরু-ছাগল আসে বটে, তবে আগের সেই জৌলুশ এখন কেবলই স্মৃতি। একসময় টরকী-বাশাইল খাল দিয়ে বিশাল সব নৌকা ও ট্রলারে গরু আসত এই হাটে। হাটের রসিদ লেখক মোহাম্মদ ইমরুল আলী হাওলাদারের খাতা আজ অনেকটা ফাঁকা থাকলেও তাঁর স্মৃতিতে ভাসে ভিন্ন এক দৃশ্য। ‘আগে দেড়-দুই শ ট্রলার আসত শুধু গরু নিয়ে। একেকটি ট্রলার ছিল বড় লঞ্চের সমান, যেখানে ১২০ থেকে ১৫০টি বিশাল গরু থাকত। প্রতি হাটে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার গরু আসত। মাইলের পর মাইল শুধু গরুর ডাক আর ব্যাপারীদের হাঁকডাক শোনা যেত।’

সেই একই হাটে আজ প্রবীণ ব্যাপারী মিজান হাওলাদারের দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। এক দশক আগেও চার-পাঁচ গাড়ি গরু বেচে বেলা দুইটার আগে পকেটে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। আর এখন সারা দিন রোদে পুড়েও একটা গরু বিক্রি করা কঠিন, অবিক্রীত গরু নিয়ে মন খারাপ করে বাড়ি ফিরতে হয়।’

দেড় টাকা থেকে লাখ টাকা দাম

দামের আকাশ-পাতাল পার্থক্যের সাক্ষী ৭০ বছর বয়সী ক্রেতা আবদুল গফুর ভূঁইয়া। তিনি হাসতে হাসতে জানান, একসময় এই হাটে দেড় টাকায়ও গরু বিক্রি হতে দেখেছেন! ৪০ বছর আগে যে সুস্থ–সবল গরুর দাম ছিল চার-পাঁচ হাজার টাকা, আজ তার দাম হাঁকা হচ্ছে সোয়া লাখের ওপর। বিক্রেতা নূর আলম ও এরশাদ শরীফের মতে, গোখাদ্যের লাগামহীন দাম আর গরুর আমদানি বন্ধ হওয়ায় দেশি খামারিদের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে।

হাটের এক কোণে একটু ভিন্ন দৃশ্য। কয়েকটি গরু ঘিরে দরদাম করছেন ব্র্যাকের ‘আলট্রা পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রাম’-এর কর্মীরা। প্রোগ্রাম অর্গানাইজার মোহাম্মদ লিটন মুন্সী এবং ব্রাঞ্চ ম্যানেজার শারমিন আক্তার অনুপা জানান, হতদরিদ্র পরিবার বিশেষ করে বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তাদের স্বাবলম্বী করতে তাঁরা বিনা মূল্যে গরু ও গোয়ালঘর তৈরির টিন দিচ্ছেন। হাটের এই কোণটি যেন এখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে।

খাজনার কোপ ও অস্তিত্বের সংকট

হাটের এই ভগ্নদশার পেছনে কাজ করছে চড়া ইজারার অর্থ আদায় আর নদীপথের নাব্যতা হারানো। স্থানীয় ব্যাপারীদের অভিযোগ, অন্য হাটের চেয়ে বেশি হারে খাজনা আদায় করা হচ্ছে। এর ওপর নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ট্রলারের বদলে এখন ট্রাকে গরু আনতে ব্যয় বেশি। দীর্ঘ ৪৫ বছর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মোহাম্মদ তোতা শরীফ বলেন, ‘বরিশালের চরমোনাই হাটে প্রতি গরুতে খাজনা মাত্র ১০০ টাকা, আর কসবা হাটে নেওয়া হয় শতাংশ হিসাবে! এক লাখ টাকার গরুতে তিন হাজার টাকা খাজনা দিলে ব্যাপারীরা বাঁচবে কী করে?’

হারিয়ে যাওয়া রং-তামাশা

তখনকার হাট মানেই ছিল এক বড় বিনোদন। হারমোনিয়াম আর ঢোল বাজিয়ে জারি-সারি গান গেয়ে ক্যানভাসাররা ওষুধ বিক্রি করতেন। সাপের খেলা আর ম্যাজিক শো ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াত শত শত মানুষ। প্রবীণ কৃষক বরকত মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আগে হাটে আইলে মনডা ভইরা যাইত। কত গানবাজনা হইত! এখন সেই শান্তি আর নাই।’

সংকটের মুখে আগামীর সম্ভাবনা

পালরদী নদী ও টরকী-বাশাইল খাল পলি জমে মরে যাচ্ছে। ময়লা ফেলে খালটি ভরাট করা হচ্ছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর সড়কপথের সুবিধা বাড়লেও নৌকেন্দ্রিক এই বন্দরের ঐতিহ্য বদল হচ্ছে। হাটের পত্তনকারী বণিক পরিবারের বংশধর পুণ্য গোপাল রায় জানান, সহযোগিতার অভাবে আধুনিক ব্যবসার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। পদ্মা সেতু চালুর পর সরাসরি পণ্য যাচ্ছে সব এলাকার দোকানে। এই বন্দরের নৌপথের বাণিজ্য ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

এই বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর আশার কথা শোনান বন্দর মালিক সমিতির সভাপতি শরীফ সাহাবুব হাসান। তিনি জানিয়েছেন, রাস্তা সংস্কার ও খাল খননের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। এই বাজার সড়কপথে জমে উঠবে।

কালের খেয়ায় পালরদী নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। এখনো মুনাফার আশায় নয়, বরং অনেকে পূর্বপুরুষের স্মৃতি রক্ষায় আঁকড়ে ধরে আছেন এই বাণিজ্যকেন্দ্রকে। নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে টরকী বন্দর আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে।