বাংলাদেশ

ভাবমূর্তি সংকটে বাংলাদেশ, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন সরকারকে

January 27, 2026
8 months ago
By SAJ
ভাবমূর্তি সংকটে বাংলাদেশ, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন সরকারকে

বাংলাদেশের ভেতর ও বাইরে থেকে ভাবমূর্তির সংকট (ইমেজ ক্রাইসিস) তৈরি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যারাই ক্ষমতায় আসবে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগের স্বার্থে ভাবমূর্তির সংকটের ইস্যুটিকে গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। আর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ভারসাম্য বজায়, মার্কিনদের সঙ্গে দর–কষাকষিসহ কূটনীতির নানা ক্ষেত্রে সাফল্য পেতে হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দলীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

আজ মঙ্গলবার সকালে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) বৈদেশিক নীতি নিয়ে আলোচনায় এই অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিজিএস ‘বৈদেশিক নীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক সম্পর্ক’ শীর্ষক একটি নীতি সংলাপের আয়োজন করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার যেই আসুক না কেন, তারা যেন দলীয় রাজনীতিকরণ না করেন। আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব আছে। আমাদের টেকসই পররাষ্ট্রনীতি দরকার। ভূরাজনীতিটাকে কীভাবে দেখব, এর সঙ্গে ভূ–অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।’

আমেনা মহসিন বলেন, বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে এবং ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতাও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় পরবর্তী সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটা ভাবমূর্তির সংকটের (ইমেজ ক্রাইসিস) মুখোমুখি হচ্ছে, সামনে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদেরকে অবশ্যই সেটার মোকাবিলা করতে হবে। এই যে ইমেজ ইস্যুটা...বাংলাদেশের পাসপোর্টের মানটা এত কমে গেল, ভিসার ক্ষেত্রে আমরা বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি। ইমেজ ক্রাইসিস থেকে বের হওয়া...এটা আমরা অনেকটা তৈরিও করছি আবার বাইরে থেকে তৈরি করানোও হচ্ছে।’

‘মব’ শব্দ কেন ব্যবহার করা যাবে না, সে প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক আমেনা মহসিন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না: হোয়াই উই কান্ট ইউজ দ্য ওয়ার্ড মব! আমরা তো মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছি, আমরা সবাই শিকার হয়েছি। লেট আস রেসপেক্টফুল টুওয়ার্ডস পিপল, জুলাইয়ের অভ্যুত্থানটাকে তো আমরা অস্বীকার করতে পারব না। কোথায় আমাদের ফেইলিয়র্সগুলো (ব্যর্থতাগুলো) ছিল, সে জায়গাতে স্রেফ ক্রিটিক (সমালোচনা) করতে হবে।’

প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে অবশ্যই এই দায়িত্ব নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন আমেনা মহসিন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনটা আমরা চাচ্ছি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজন আছে, বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে।’

আলোচনায় ভারতীয় গণমাধ্যমের সমালোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘ইন্ডিয়ান মিডিয়া আর নট ভেরি কাইন্ড টুওয়ার্ডস আস (ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আমাদের প্রতি খুব সদয় নয়)। তারা বক্তব্যগুলো দিচ্ছে যে আমরা টেরোরিজম এক্সপোর্ট করছি—এই জায়গাগুলো কাউন্টার করার সক্ষমতা আমাদের তৈরি করতে হবে।’

সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে বিশ্বের সব প্রধান শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হবে। এর সঙ্গে সরাসরি বিনিয়োগের বিষয়টি জড়িত। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য উপযুক্ত ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যা একই সঙ্গে দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে শক্তিশালী করতেও সহায়ক হবে। সরকার যদি জনভিত্তির ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে যেকোনো সরকারই কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে শক্ত ও কার্যকর অবস্থান নিতে সক্ষম হবে।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ক্ষমতায় এসে পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক উন্নয়নের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। ঘোষিত অগ্রগতির পরিবর্তে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য দেখা যায়নি। বরং প্রধান উপদেষ্টা অতিমাত্রায় বিদেশ সফর করেছেন, যা সংখ্যার দিক থেকে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে, যেখানে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। ইশতেহারের মূল লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা এবং জনগণ ও দেশের স্বার্থনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন।

নতুন সংবাদমাধ্যম চর্চার সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলার জন্য জাতীয় ঐকমত্য জরুরি, কিন্তু বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বিভাজিত অবস্থায় রয়েছে। দেশে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকায় স্বাধীন ও বাস্তবভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন কঠিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি; বরং দুই প্রধান দলই প্রায় একই ধরনের পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেছে।

সংলাপের সঞ্চালক ও সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন হলেও বৈদেশিক নীতি নিয়ে আলাদা কোনো কমিশন হয়নি এবং এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগও দেখা যায়নি। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকলেও এর স্থায়ী সমাধানে বা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারেও পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি।

আলোচনায় আরও অংশ নেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহসিন আলী খান, সাবেক সংসদ সদস্য ও জনতা পার্টি বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার মিলন, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম সরোয়ার হোসেন, সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী, এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, এবি পার্টির সহকারী সদস্যসচিব নাসরিন সুলতানা।