বাংলাদেশ

ভয় থেকে মুক্ত পরিবেশে ফিরে আসতে চান বাউলশিল্পী আবুল সরকার

September 11, 2026
1 month ago
By SAJ
ভয় থেকে মুক্ত পরিবেশে ফিরে আসতে চান বাউলশিল্পী আবুল সরকার

সমাজের মৌলিক পরিবর্তনের জন্য দেশজুড়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো প্রগতিশীল চিন্তার লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের জাতীয় কনভেনশন। আজ শুক্রবার ছুটির দিনে সকাল থেকে সারা দিন নানা কর্মসূচির ভেতর দিয়ে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় এই কনভেনশন হয়।

‘কণ্ঠে মোদের কুণ্ঠাবিহীন নিত্য-কালের ডাক’ স্লোগান নিয়ে কনভেনশনের আনুষ্ঠানিকতার সূচনা হয় সকালে জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনের লবিতে। সমবেত কণ্ঠে ‘এসো মুক্ত করো’, ‘ জনতার সংগ্রাম চলবেই’ ও ‘দুর্গমগিরি’ এই তিন সংগীতের পর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পীরা।

উদ্বোধন ঘোষণা করেন বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক নূরুল কবির। তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন হলো রাজনৈতিক আন্দোলনের পাটাতন। বর্তমান সময়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারা এগিয়ে নিতে এই কনভেনশন অত্যন্ত প্রয়োজন। উদ্বোধনের পর লেখক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নাট্যশালার প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করে।

এর আগে সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লেখক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মীরা কনভেনশন কেন্দ্রে আসতে থাকেন। প্রথমেই তাঁরা নাম নিববন্ধন করেন।

আয়োজকেরা জানান, দেশের ৪৫টি জেলা থেকে বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা ছাড়াও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে কনভেনশনে অংশ নিয়েছেন। তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে চেনাজানা, কুশল বিনিময় ও আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও শ্রমজীবী–পেশাজীবী সংগঠনের নেতারাও এসেছিলেন অতিথি হয়ে।

মিলনায়তনের লবি সাজানো হয়েছিল সুদৃশ্য সজ্জায়। সব মিলিয়ে কনভেনশন উপলক্ষে এক উৎসমুখর আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল জাতীয় নাট্যশালায়।  

উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতার শেষে মিলনায়তনে শুরু হয় উদ্বোধনী অধিবেশন। একক কণ্ঠে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের বিখ্যাত গণসংগীত ‘শঙ্খচিল’ পরিবেশন করেন শিল্পী মাইশা সুলতানা। আবৃত্তি করেন দীপক সুমন। খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড’ জুম্ম জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি অবলম্বনে বিশেষ নৃত্য পরিবেশন করে। এরপর শুরু হয় আলোচনা পর্ব।

শুরুতেই এই কনভেনশনের পরিপ্রেক্ষিত ও লক্ষ্য তুলে ধরেন এই আয়োজনের সভাপতি ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামসেদ আনোয়ার। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনার প্রবর্তিত নিবর্তনমূলক সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ৬ মে রাজধানীতে এক প্রতিবাদ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের সূত্রপাত। তখন ৩১টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন যৌথভাবে এই কর্মসূচির পালন করেছিল। পরে সরকারের ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলন অব্যাহত ছিল। এরপর ২০২৪ সালে ২০ জুলাই কারফিউ জারি করা হলে সাংস্কৃতিক কর্মীদের এই মোর্চা প্রথম কারফিউ ভেঙে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদী সমাবেশ ও গানের মিছিল করে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ জুলাই গানে গানে প্রতিবাদী শিল্পীরা রাজপথ দখল করেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে ২ আগস্ট করেছিলেন দ্রোহযাত্রা।

জামসেদ আনোয়ার বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য অক্ষুণ্ন আছে। দেশে আইনের শাসনের পরিবর্তে মাজার, ভাস্কর্য ভাঙা, মব–সন্ত্রাস, কবিগান, বাউলগান, যাত্রাপালা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও নারীদের হেনস্তা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের যেভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, তা অব্যাহত রয়েছে। তারা স্বাধীন মতপ্রকাশ, মুক্তচিন্তা ও সংস্কৃতির ওপর সুপরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করছে। এই পরিস্থিতিতে গণমানুষের পক্ষে সৃজনশীলতার চর্চা ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অব্যাহত রাখার জন্য ব্যাপক ঐক্যের প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই এই কনভেনশন আয়োজন করা হয়েছে।

নূরুল কবির বলেন, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সারা দেশে সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাটাতনে রাজনৈতিক সংগ্রাম অভীষ্ট লক্ষ্যের অভিমুখে নিয়ে যেতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় ইতিহাসকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এটা করা যায়নি বলেই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। একই কারণে নব্বই ও উনসত্তরের অভ্যুত্থানেরও কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা যায়নি। তিনি বলেন, যত দিন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক পাটাতনের ওপর রাজনৈতিক সংগ্রাম না দাঁড়াবে, তত দিন বিপ্লব সফল হবে না। তিনি সাংস্কৃতিক কর্মীদের এই কার্যক্রমকে আরও ব্যাপকভাবে সারা দেশে সম্প্রসারিত করার আহ্বান জানান।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, প্রগতিশীল লেখক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মীদের এই কনভেনশন একটি নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সাংস্কৃতিক লড়াই সব লড়াইয়ের ভিত্তি। বৈষম্যবাদী চিন্তা, উগ্রধর্মীয় চিন্তা, সাম্প্রদায়িক চিন্তা এসবের নিজস্ব শক্তি আছে। সমাজের ভেতর থেকেই এসব গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই তাদের প্রতিহত করতে হলে প্রগতির পক্ষের প্রবল শক্তির প্রয়োজন। সেই শক্তি আসবে ঐক্যের মাধ্যমে। এ কারণে এই কনভেনশন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কনভেনশনের উদ্যোক্তাদের আরও বেশি সংখ্যায় নারী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির পরামর্শ দেন।

সম্প্রতি জামিনে কারামুক্ত বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজ বলেন, কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও তিনি নিজেকে মুক্ত বলে অনুভব করতে পারছেন না। তিনি তাঁর নিজের মতো করে গান করতে পারেন না। বাড়ি থেকে বের হতে পারেন না। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। সব সময় ভয়ের মধ্যে রয়েছেন। এই বন্দিত্ব, এই ভয় থেকে মুক্ত পরিবেশে ফিরে আসতে চান তিনি। সমাজে সেই পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানন। যাঁরা তাঁর মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, প্রগতিশীল লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে দানবীয় আকার পাওয়া ধর্মীয় উগ্রবাদীদের রুখে দিতে হবে। সাহসের সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মীদের সংগ্রাম করতে হবে।

এই পর্বে আরও বক্তব্য দেন উনসত্তরের অভ্যুত্থানের নেত্রী দীপা দত্ত, লেখক রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়, যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এস আলম, প্রগতি লেখক সংঘের কোষাধ্যক্ষ দীনবন্ধু দাস, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্রের আহ্বায়ক বিমল কান্তি দাস, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, সমাজচিন্তা ফোরামের আহ্বায়ক কামাল হোসেন প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ও কনভেনশন প্রস্তুতি পরিষদের সদস্যসচিব মফিজুর রহমান।  

প্রথম অধিবেশনের পরে ছিল দুপুরের খাবারের জন্য বিরতি। বিকেলে ছিল সাংগঠনিক অধিবেশন, শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।