‘যে-ই আমার কথা শুনছেন, আমাদের সাহায্য দরকার’: হঠাৎ ১৭ হাজার ফুট নামার পর যেভাবে রক্ষা পেল ফ্লাইট ১০৭৩
ফ্লাইট এফজেড-১০৭৩ যখন মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের জলরাশির ওপর দিয়ে পশ্চিম দিকে ইসরায়েল অভিমুখে যাচ্ছিল, তখন উড্ডয়নে ২০ মিনিট দেরি হওয়ায় যাত্রীরা হয়তো বিরক্ত হয়েছিলেন। স্বল্প খরচের উড়োজাহাজ সংস্থা ফ্লাইদুবাইয়ের তেলআবিবগামী দৈনিক এই ফ্লাইট সুবিধাজনক ও নির্ভরযোগ্য। বিরতিহীন এ ফ্লাইটে সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। দুবাই থেকে এটি এমন সময়ে ছাড়ে, যাতে স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে পৌঁছে যায়।
গতকাল বুধবারের বিপর্যয়কর ফ্লাইটটির ক্ষেত্রে অবশ্য তা হয়নি। যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। বরং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এটি হাজার হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। এরপর উড়োজাহাজটি সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করতে সক্ষম হয়। এটাকে অলৌকিক ঘটনা বলা যেতে পারে। কারণ, ছবিতে দেখা গেছে, উড়োজাহাজটির লেজের বড় একটি অংশ নেই।
সৌদি আরবের তাবুকের প্রিন্স সুলতান বিন আবদুলআজিজ বিমানবন্দরে অবতরণের পর যাত্রীরা উড়োজাহাজ থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁদের কয়েকজনের শরীরে রক্ত লেগে ছিল। তাঁরা পাইলটের ওপর আরেক পাইলটের ছুরিকাঘাতের ঘটনা নিয়ে নানা কথা বলেন। এ ছাড়া উড়োজাহাজের ভেতর থেকে অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওতেও ওই সহিংস ঘটনার পরের চিত্র দেখা গেছে।
উড়োজাহাজের ভেতরে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুজন ব্যক্তি মেঝেতে শুয়ে আছেন। তাঁদের মুখে অক্সিজেনের মাস্ক। সরু চলাচলের জায়গায় যাত্রীরা তাঁদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন। একজনের সাদা শার্ট রক্তে লাল হয়ে গেছে। তাঁর কাঁধে পাইলটের পোশাকের পরিচিত স্ট্রাইপ দেখা গেছে। তাঁকে প্রায় অচেতন মনে হচ্ছিল। অন্য ব্যক্তি ধীরে ধীরে চোখের পাতা ফেলছিলেন। তাঁর পাশে দেয়ালে রক্তের দাগ দেখা যায়। ক্যামেরার বাইরে থাকা একজন আহত ব্যক্তিকে সংজ্ঞা ধরে রাখতে উৎসাহিত করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘ঘুমাবেন না।’
আরেকটি ভিডিওতে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজটিকে কাঁপতে দেখা যায়। এ সময় যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার ও কান্নাকাটি করছিলেন। ভিডিওটি উড়োজাহাজের পেছনের দিকের কোনো আসন থেকে ধারণ করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।
উড়োজাহাজটিতে প্রায় ১৫০ জন ইসরায়েলি যাত্রী ছিলেন বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম।
ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, যাত্রীদের সাক্ষ্য, ফ্লাইটের গতিপথ পর্যবেক্ষণের তথ্য এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কথা থেকে ভয়াবহ সব ঘটনার বিবরণ পাওয়া গেছে। উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর এসব ঘটনা শুরু হয়।
ফ্লাইটের গতিপথ পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল। সেখান থেকে দুই মিনিটের কম সময়ে হঠাৎ ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়। এত দ্রুত ও তীব্রভাবে উড়োজাহাজটি নিচে নেমে যাওয়ার কারণে এর রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।
এর কয়েক মিনিট পর উড়োজাহাজটি ‘স্কোয়াক কোড’ হিসেবে একাধিক জরুরি সংকেত পাঠায়। এই চার অঙ্কের কোড সাধারণত উড়োজাহাজের অবস্থান জানানোর জন্য পাইলটরা ব্যবহার করেন। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে পাইলটদের রেডিও যোগাযোগ থাকলেও এসব কোড ব্যবহার করা যায়।
ফ্লাইটরাডার২৪-এর উড়োজাহাজ পর্যবেক্ষকেরা বলেন, ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি জরুরি পরিস্থিতি ও ছিনতাইয়ের সংকেত পাঠিয়েছিল। উড়োজাহাজটি জর্ডান সীমান্তের কাছে অস্বাভাবিকভাবে একটি চক্কর দেয়। এরপর দিক পরিবর্তন করে দক্ষিণ দিকে যেতে থাকে।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক যাত্রীর মাথায় খোলা ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। তিনি সাহায্যের জন্য অনুরোধ করছেন। বলছেন, উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের দিকে যাচ্ছে এবং নিচে নামছে। হিব্রু ভাষায় তিনি বলেন, ‘যেই শুনছেন, আমাদের সাহায্য দরকার।...আমরা সৌদি আরবের তাবুক এলাকায় আছি। জায়গাটি আমরা চিনি না। পাইলট ছাড়া সব যাত্রী ঠিক আছেন। আমাদের সাহায্য দরকার।’
ওই বিপৎসংকুল মুহূর্তগুলোতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক ও অপ্রমাণিত কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমে ককপিটে হাতাহাতি বা মারামারির ঘটনা ঘটে। এরপর যাত্রীরা সরু পথ দিয়ে ককপিটের দিকে ছুটে যান। পরে যাত্রী হিসেবে ভ্রমণরত এক বা একাধিক পাইলট উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেন, যাতে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় এড়ানো যায়।
ইসরায়েলের সংবাদপত্র হারেৎজ এক যাত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, উড়োজাহাজটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করেছিল।
দালিয়া শপিগেল নামের ওই যাত্রী বলেন, ‘হঠাৎ পুরো উড়োজাহাজে ভয়াবহ চিৎকার শুরু হয়।’ এরপর ‘তিন থেকে পাঁচজন লোক ককপিটে ঢুকে পড়েন।’ তাঁরা হামলাকারী পাইলটকে ধরে ফেলেন এবং আহত পাইলটের চিকিৎসা শুরু করেন।
শপিগেল হারেৎজকে বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারলাম, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হচ্ছে। এরপর ফ্লাইট অব্যাহত থাকে। ধীরে ধীরে ককপিটে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে তথ্য আসতে শুরু করে।’
মিরিয়াম শিরা ওহায়ন নামের আরেক যাত্রী বলেন, ‘সহকারী পাইলট অন্য পাইলটকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি মূলত উড়োজাহাজটি নিয়ে আত্মঘাতী হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিলেন।’
ওহায়নের মা বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন। সেখান থেকে ওহায়ন স্পিকারফোনের সাহায্যে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর মা স্পিকারফোন ধরে ছিলেন।
ওহায়ন বলেন, উড়োজাহাজটি ‘সত্যিই বিধ্বস্ত হতে যাচ্ছিল। তবে কিছু মানুষের উপস্থিত বুদ্ধির কারণে সহকারী পাইলটকে নিরস্ত্র করা সম্ভব হয়েছে।’
এ যাত্রী আরও বলেন, ‘সেখানে একজন চিকিৎসকও ছিলেন। তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। অন্যরাও দুজনকে চিকিৎসা দিয়েছিলেন।...কিন্তু উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হতে যাচ্ছিল—এটাই ছিল সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয়। আর অভিযুক্ত হামলাকারী সেটিই করার চেষ্টা করছিল।’
গতকাল পরে এক বিবৃতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাই জানায়, ফ্লাইটটিতে ‘ফ্লাইদুবাইয়ের দায়িত্বরত ক্রুরা’ পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। তাঁরা গতিপথ পরিবর্তন করে উড়োজাহাজটি নিরাপদে তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণ করান।
বিমান সংস্থাগুলো প্রায়ই নিজেদের পাইলটদের যাত্রী হিসেবে বিভিন্ন বিমানবন্দরে পাঠায়। জরুরি সংকেতগুলো ওই পাইলটেরাই পাঠিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলমোগ ইতালি নামের এক যাত্রী বিবিসিকে বলেন, উড়োজাহাজটিতে থাকা যে পাইলটরা সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনেন, তাঁদের একজন ছিলেন ব্রিটিশ। আলমোগ ইতালি বলেন, ‘দুজন অতিরিক্ত পাইলট উড়োজাহাজটিতে ছিলেন। পরবর্তী ফ্লাইট পরিচালনার দায়িত্ব তাঁদের ছিল। দুজনই ইউরোপীয়। তাঁদের একজন ব্রিটিশ। তাঁরা ককপিটে ঢুকে উড়োজাহাজকে ওপরের দিকে তোলেন, উড়োজাহাজটিকে স্থিতিশীল করেন এবং আমাদের সৌদি আরবে অবতরণ করান।’
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অসপ্রে ফ্লাইট সলিউশন্সের ঝুঁকি বিভাগের প্রধান স্তানিস্লাভ বুখমান বলেন, তদন্তকারীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খতিয়ে দেখতে পারেন। এর মধ্যে পাইলটদের যাচাই-বাছাই কীভাবে করা হয়েছিল এবং যে বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করা হয়েছিল, সেখানে ক্রুদের তল্লাশি ও নিরাপত্তা যাচাই কীভাবে করা হয়েছিল, সেগুলোও থাকবে।
ককপিটে কীভাবে প্রবেশ করা হয়ে থাকতে পারে, সে বিষয়ে বুখমান বলেন, জরুরি প্রবেশের একটি কোড ব্যবহার করে কেবিন ক্রুরা ককপিটে প্রবেশের অনুমতি চাইতে পারেন। তিনি বলেন, ‘পাইলটরা অচেতন হয়ে পড়লে এমন পরিস্থিতির জন্য এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এর মধ্যে একটি নিরাপত্তাব্যবস্থাও রয়েছে। পাইলটরা সচেতন থাকলে এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করলে তাঁরা ওই প্রবেশের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে দরজা বন্ধ রাখতে পারেন। ছিনতাই বা জিম্মি পরিস্থিতিতে ককপিট সুরক্ষিত রাখার জন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
স্তানিস্লাভ বুখমান বলেন, ‘এ পর্যায়ে এফজেড ১০৭৩-এর ককপিটে কীভাবে প্রবেশ করা হয়েছিল, তা বলার মতো যথেষ্ট তথ্য আমাদের হাতে নেই। ককপিটের দরজা হয়তো ক্যাপ্টেন নিজেই খুলেছিলেন। কারণ, তিনি সহকারী পাইলটের উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করছিলেন বলে জানা গেছে। আবার কেবিন ক্রুরাও জরুরি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দরজা খুলে থাকতে পারেন।’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, উড়োজাহাজটির এক পাইলট পরিকল্পিতভাবে সেটি বিধ্বস্ত করে বেশির ভাগ ইসরায়েলি যাত্রীকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। যাত্রীরা তাঁদের তৎপরতার মাধ্যমে ‘বড় ধরনের বিপর্যয়’ ঠেকিয়েছেন। উড়োজাহাজটি অবতরণের পর অভিযুক্ত হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান নেতানিয়াহু।
গতকাল ঘটনার অল্প সময়ের মধ্যে দেওয়া ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘উড়োজাহাজটি ইসরায়েলের দিকে আসার সময় এক পাইলট অন্য পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর তিনি (হামলাকারী) উড়োজাহাজে থাকা সবাইকে নিয়ে সেটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
তবে ফ্লাইদুবাই বলেছে, এফজেড ১০৭৩-এর ককপিটে একটি ‘হাতাহাতির ঘটনা’ ঘটেছিল। ঘটনার উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বিষয়ে সতর্ক করেছে তারা।
ফ্লাইদুবাইয়ের এক মুখপাত্র বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘আমরা এখনো ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছি। এ পর্যায়ে ঘটনার পেছনের কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। ঘটনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
কর্তৃপক্ষ এ ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করছে ওই মুখপাত্র বলেন, ‘তাই আমরা সবার প্রতি আগেভাগে কোনো ধরনের অনুমানমূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করছি।’