যেভাবে ভেনিসে জায়গা করে নিল বাংলাদেশের সিনেমা
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক কোনো বিভাগে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিল বাংলাদেশের কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। মর্যাদাপূর্ণ এ উৎসবের অরিজোন্তি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বেলা তিনটায় বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো এই চলচ্চিত্র উৎসবের আগামী আসরের মনোনয়ন ঘোষণা শুরু হয়। ৩টা ৩৫ মিনিটে উৎসব সভাপতি আলবের্তো বারবেরা বাংলাদেশের রুবাইয়াত হোসেনের সিনেমাটির নাম ঘোষণা করেন।
এর আগে ২০১০ সালে ইশতিয়াক জিকোর স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা ৭২০ ডিগ্রিজ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। সে চলচ্চিত্রটিও প্রযোজনা করেছিল রুবাইয়াতের খনা টকিজ। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এরও বাংলাদেশি সহপ্রযোজক খনা টকিজ। ‘মেহেরজান’, ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’–এর পর ক্যারিয়ারের চতুর্থ সিনেমা দিয়ে ভেনিসের প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নেওয়াটা রুবাইয়াতের জন্য সহজ ছিল না। ভেনিসে হাজারো সিনেমার মধ্য থেকে ধাপে ধাপে নির্বাচিত হয় চূড়ান্ত তালিকা। গতকাল রুবাইয়াত প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিনেমাটি ভেনিসে জমা দেওয়ার কয়েক দিন পরই জানতে পারি, আয়োজকেরা এটি পছন্দ করেছেন। কিন্তু কোন শাখার জন্য, সেটা নিয়ে কিছুই বলেননি। অবশেষে মাত্র জানতে পারি, সিনেমাটি উৎসবের অফিশিয়াল শাখা হরাইজন (অরিজোন্তি) বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে।’
‘এখন লিখতে পারেন’ইতালির ফ্যাশন হাউস প্রাডার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ফন্ডাজিওনে প্রাডা থেকে চলতি বছর তহবিল পায় ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। সিনেমাটির প্রথম ধাপের সম্পাদনা শেষ হয়েছে সেই সময়। তারপর সিনেমাটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে সাবমিট করা শুরু হয়। প্রথম সারির উৎসবগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু বরাবরের মতোই এ বিষয়ে তেমন কোনো খবর দিচ্ছিলেন না রুবাইয়াত। প্রাডার তহবিল পাওয়া সিনেমাগুলো বেশির ভাগ ভেনিসের মনোনয়নে এগিয়ে থাকে। দুই মাস আগে পরিচালক শুধু জানান বড় উৎসবে প্রিমিয়ার হচ্ছে তাঁর সিনেমা। পরে বলেই ফেললেন ভেনিসের কথা। পাশাপাশি সতর্ক করলেন, এখন কিছুই লেখা যাবে না। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে অনেক সময় মনোনয়ন বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অবশেষে গতকাল রুবাইয়াত বললেন, ‘ভেনিসে প্রিমিয়ার করছি—এখন লিখতে পারেন।’
সংগ্রাম থেকে ভেনিসেনারী হয়ে সিনেমা বানাতে এসে এই দ্বিতীয় সহস্রাব্দেও বহু মানুষের কথা শুনতে হয়েছে। এক যুগের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে সবকিছু নীরবে সহ্য করে গেছেন; কিন্তু কখনোই আত্মবিশ্বাস হারাননি। সিনেমা নিয়ে একদিন বড় জায়গায় যাবেন, সেই বিশ্বাস সব সময় ছিল। তবে এত অল্প সময়ে ভেনিসের মতো উৎসবে তাঁর সিনেমা জায়গা পাবে, শুটিংয়ের সময়েও এটা ভাবেননি। রুবাইয়াত বলেন, ‘আগের সিনেমা কোথায় জমা দেব, সেটা আগেই ভাবতাম। কিন্তু এবারের সিনেমাটি ছিল আমার জন্য বিশেষ এক ব্যক্তিগত জার্নি। বাবা মারা যাওয়ার পরে সিনেমার মধ্য দিয়েই নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করেছি। এর মধ্যে আবার অসুস্থ ছিলাম। এসব কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রথম আমার বাসায় শুটিং করেছি। কোনো উৎসবে যাবে, এসব মাথায় ছিল না। আমার জায়গা থেকে সৎভাবে সিনেমাটির শুটিং করেছি, সম্পাদনা করেছি, ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করেছি, স্বাধীনভাবে সবকিছু করেছি।’
বাংলা সিনেমার বড় অর্জনকান চলচ্চিত্র উৎসবের আঁ সার্তে রিগা বিভাগে এর আগে মনোনয়ন পায় আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের সিনেমা ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। সেটা ছিল কানের অফিশিয়াল শাখায় বাংলাদেশের কোনো সিনেমার প্রথম মনোনয়ন। তারপর বাংলাদেশের সিনেমার বড় অর্জন ভেনিসের এই মনোনয়ন। রুবাইয়াত আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের হয়ে সিনেমা দিয়ে ভেনিসে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছি, এটাই আমার জন্য অনেক সম্মানের। আমি চাই, দেশের সিনেমা আরও ভালো জায়গায় যাক।’
১৯৩২ সালে যাত্রা শুরু করা ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হরাইজন বা অরিজোন্তি। তরুণ ও আগামীর প্রতিভাবান নির্মাতাদের সিনেমা তুলে ধরে এই শাখা। এ শাখার সিনেমায় স্থানীয় গল্প, উপস্থাপনা, গল্প বলার ধরন, বিষয়বস্তুর নতুনত্ব, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব রয়েছে—এমন চ্যালেঞ্জিং গল্পের সিনেমাগুলোকেই তুলে ধরে। সেখানে হাজারো সিনেমার মধ্যে ১৯টি সিনেমা নির্বাচিত হয়েছে। এই বিভাগে আরও জায়গা করে নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নির্মাতা অনুপর্ণা রায়ের ‘লাভারস ইন দ্য ব্লু নাইট’। গত বছর এ বিভাগে অনুপর্ণার আগের সিনেমা ‘সংস অব ফরগটেন ট্রিজ’-এর জন্য সেরা পরিচালকের পুরস্কার জিতেছিলেন।
সামাজিক আধারে হরর মসলাবিয়ে, মেকআপ ও একটি বিউটি পারলারের গল্প নিয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক হরর সিনেমা। বিয়ের সাজের প্রস্তুতি নিতে নিতে সৌন্দর্য, শরীর, বিশ্বাস, স্মৃতি ও ভয়কে ঘিরে এক অস্বস্তিকর ও রহস্যময় জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে একটি মেয়ে। সামাজিক জনরা সিনেমাটির সঙ্গে যোগ হয়েছে হরর ঘরানা। রুবাইয়াত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নারী হয়ে সব সময় নারীদের গল্প বলি। এবারও সিনেমায় নারীদের কথা তুলে ধরেছি। আর আমি চারপাশে যা দেখি, সেগুলোই গল্প আকারে জায়গা পায়। এবারও আমার চেনা গল্প বলেছি। যে গল্পের সঙ্গে আমার নারী হিসেবে বহু ইমোশন জড়িয়ে রয়েছে।’জার্মান ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ড, পর্তুগালের ফিল্ম ইনস্টিটিউট, ইউইমেজেস থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড। পর্তুগাল, নরওয়ে, জার্মানি, ফ্রান্স ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। সিনেমাটির বিশ্বব্যাপী ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্ব নিয়েছে আলোচিত প্রতিষ্ঠান সিনেমা বুটিক।
প্রধান চরিত্রে জাইনীন‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন করিম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা আমার অভিনীত প্রথম সিনেমা। সিনেমাটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হচ্ছে। আমি খুবই খুশি। উৎসবে অংশ নেব।’সিনেমায় আরও অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ্ বিনতে কামাল, শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম ও মোহাম্মদ বারী। শিল্পীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রুবাইয়াত বলেন, ‘স্বল্প ব্যাপ্তি জানার পরও বাঁধন, সুনেরাহ্, শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলমসহ সবাই আগ্রহ দেখিয়ে এগিয়ে এসেছেন, এ জন্য সবার কাছে কৃতজ্ঞতা। কলাকুশলীদের সহায়তা ছাড়া এত দূরে আসতে পারতাম না।’আগামী ২ সেপ্টেম্বর শুরু হবে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, চলবে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। টিম নিয়ে উৎসবের লালগালিচায় হাঁটতে চান রুবাইয়াত, পরে সিনেমাটি নিয়ে এক বছর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে ঘুরতে চান।