যখন লস অ্যাঞ্জেলেসে যাই, তখন বাসাভাড়া দেওয়ার মতো টাকাও ছিল না: সঞ্জয়
July 31, 2026
2 months ago
By SAJ
প্রথম আলো: আপনাকে আবারও অভিনন্দন। বাংলাদেশের একজন হয়ে ফিফা বিশ্বকাপের এবারের মঞ্চে উদ্বোধনী দিনে পারফর্ম করেছেন...সঞ্জয় দেব : আমি এখনো সবাইকে বলি, বাংলাদেশ একদিন না একদিন সেখানে যেত। হয়তো আমি থাকতাম, নয়তো আমি না। তবে আমি খুবই ভাগ্যবান যে এবার সেই যাত্রায় আমি ছিলাম। এটা খুবই সম্মানের, এখন পর্যন্ত আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্মান।সঞ্জয় দেবছবি : প্রথম আলোপ্রথম আলো : বিশ্বকাপের মঞ্চে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে প্রথমে কী মনে হয়েছিল?সঞ্জয় দেব : আমার তখন ছোটবেলার কথা বারবার মনে হচ্ছিল। আমি সব সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলতাম, একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার হব। (হাসি) সব সময় আমার স্বপ্নগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখতাম। আমার মনে হয়, সেটাই আমার জীবনের লক্ষ্য তৈরিতে সহযোগিতা করেছে। মানুষ শুনলে এটাকে হয়তো অন্য রকম মনে করবে—কিন্তু এটাই সত্য, আমি কখনো হার মেনে নিতাম না। আমি কখনো হারিনি—হয় জিতেছি, নয়তো শিখেছি।সঞ্জয় দেবছবি : মীর হোসেনপ্রথম আলো: এত বড় স্বপ্ন দেখার সাহস পেলেন যেভাবে...সঞ্জয় দেব : জানি না। আমি যতটা মনে করতে পারছি, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যখন চলে যাই, ওখানে পড়াশোনা শুরু করলাম। তবে মিউজিশিয়ান হতে চাইতাম। সব সময় কিছু একটা হতে চাইতাম। যখনই বেড়ে উঠি, স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। কিছু একটা অর্জন করেতে চাই। সিলিক্যাল ভ্যালি—সত্যি বলতে, সে জায়গাটা আমি ভালোবাসি। সাগরপাড়ের সেই জায়গাটা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। অ্যাপল, গুগল থেকে শুরু করে সব স্বপ্নবান সেই সাগরপাড়ের সে এলাকায়, ওরাই আমার স্বপ্নটাকে বড় করে দিয়েছে। আমার স্কুলের শিক্ষকেরাও স্বপ্ন এগিয়ে নিতে প্রতিনিয়ত পাশে ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে ওখানে যাওয়ার পর দেখলাম, বেঁচে থাকার জন্য আম্মা–আব্বা দুটো কাজ করেছেন। অনেক কষ্টের জীবন। চারজনের সংসারে কষ্টের শেষ ছিল না। আমরা সেখানে যাওয়ার ঠিক আগে ছোট ভাইয়ের জন্ম। আমি তখন মনে মনে ভাবলাম, আমার আম্মা–আব্বার কষ্ট দূর করতে এমন কিছু একটা করব। এভাবেই যেন কীভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছি। আরও পড়ুনসিলেট-চট্টগ্রাম, সিলিকন ভ্যালি হয়ে ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে, কে এই সঞ্জয়১০ মে ২০২৬প্রথম আলো: আপনার মা–বাবা কি চেয়েছিলেন সংগীতে আপনি বেড়ে ওঠেন, এটাই আপনার পেশা হোক?সঞ্জয় দেব : আমার আম্মা তো গাইতেন। নানিও। আমাদের বাড়িতে যখন গানের আসর বসত, তখন আমি তবলা বাজাতাম। আমি তখন ইংরেজি খুব একটা ভালো বলতে পারতাম না। এখন বাংলায় একটু সমস্যা হয়। মানুষের সঙ্গে অনেক সময় ধরে কথা বলতে পারি না। তবে মিউজিকই হচ্ছে আমার অভিব্যক্তি প্রকাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। বন্ধুদের সঙ্গে যখন আড্ডা দিই, তখন তাদের আমার দেশের মিউজিকের সঙ্গে পরিচয় করাই। আর আমি যেটা নতুন নতুন তৈরি করছি, সেটাও। যুক্তরাষ্টে। ওখান থেকে আমার মিউজিকের প্রতি নির্ভরতা তৈরি হয়। তবে আমার আঙ্কেল, ১২তম জন্মদিনে একটা ল্যাপটপ উপহার দেন। ওই সময়ে সবার বিগ বিগ ডেস্কটপ, টিভির মতো দেখতে মনিটর। আমি ল্যাপটপ পেয়ে মহা খুশি। একই সঙ্গে তিনি আমাকে অ্যাসেট প্রো সিডি কিনে দেন। বলেছিলেন, তোমার মধ্যে যদি সুর থাকে, এসব সফটওয়্যার ব্যবহার করে গান বানাতে পারবে। ওই ব্যাপারটা আমার জীবন বদলে দেয়। আমার পরিবারের সবাই জানত যে সংগীতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমি তবলা বাজাতে ভালোবাসি। আমি আমার মাসহ অনেকের সঙ্গে তবলা বাজাতাম। আমি সব সময় নিজেকে বলতাম, আমি ওয়ান ম্যান ব্যান্ড হতে চাই। তাই কেমনে আমি প্রতিটা ইনস্ট্রুমেন্ট একটু একটু করে বাজিয়ে ওয়ান ম্যান ব্যান্ড হতে পারি—সেই চেষ্টা করি। সে কারণে আমি হয়তো সংগীত প্রযোজক ও ডিজে হতে পেরেছি। ক্লাস এইটে, তখন এসব করতে থাকি। পরিবার বরাবরই আমার সাপোর্ট সিস্টেম হিসেবে কাজ করেছে।সঞ্জয় দেবছবি : প্রথম আলোপ্রথম আলো: বিশ্বকাপ ফুটবল মঞ্চের উদ্বোধনী দিনে আপনার কস্টিউম সবার নজর কেড়েছে। আপনার পরনের জ্যাকেটে ফুটে ওঠে টাইগারের নকশা, জাতীয় ফুল শাপলা এবং বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার অনুষঙ্গ। দেশ–বিদেশের অনেকে আপনাকে এভাবে দেখে আবেগপ্রবণ হয়েছে। এটা কি আপনি সচেতনভাবে করেছেন?সঞ্জয় দেব : আমার কাছে মনে হয়েছে এই মঞ্চ দিয়ে আমি পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশকে কানেক্ট করতে পারব। আমি নর্থ আমেরিকায় পারফর্ম করেছি—বেড়ে উঠেছি যুক্তরাষ্ট্রে। সবকিছু আমাকে এটা শিখিয়েছে, কে এই আমি? আমি ইংরেজিতে গানটা বানিয়েছি। কিন্তু আমার শিকড়টাকেও দেখাতে চেয়েছি। আমি সারা পৃথিবীর মানুষকে গানের মাধ্যমে আমার বাংলাদেশকে দেখাতে চেয়েছি। তাই এমনভাবে চিন্তা করা।আরও পড়ুনবিশ্বকাপের মঞ্চে বেঙ্গল টাইগার ও লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে সঞ্জয়১৩ জুন ২০২৬সঞ্জয় দেবছবি :প্রথম আলোপ্রথম আলো: ২৫ বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে আপনি যুক্তরাষ্ট্রে। সংগীতে এত দূর আসার পথে একজন অভিবাসী বাংলাদেশি হিসেবে কোনো কষ্ট কিংবা বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে কি?সঞ্জয় দেব : অবশ্যই হয়েছে। শুরুর দিকে তো মিউজিক প্রোডাকশন সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই ছিল না। খুবই খারাপ মিউজিক বানাতাম। বন্ধুরা বিরক্ত হতো, আম্মা–আব্বাও বলতেন, ‘এসব কী বানাচ্ছ?’ তবে উৎসাহও কিন্তু দিতেন। কিন্তু আমি সেসব নিয়ে কখনো ভাবিনি। কারণ, আমি শুধু ভালোবেসেই কাজটা করে গেছি। মিউজিক ছাড়া অন্য কোনো কিছুই আমাকে তেমন টানত না। গেম খেলতাম না, অন্য কিছু নিয়েও খুব একটা আগ্রহ ছিল না। তবে ফুটবলের শিল্প, কৌশল—এসব দেখতে ভালো লাগে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ এলে সেই আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। শেষ বিশ্বকাপের প্রায় সব ম্যাচই দেখেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে, আমার কাছে মিউজিকের চেয়ে বড় কিছু নেই। মিউজিকের জন্য জীবনে অনেক অদ্ভুত ও কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু কখনো মনে হয়নি, এই পথ ছেড়ে দেব। বরং বিশ্বাস করেছি, মিউজিকই এমন একটি ভাষা, যা দিয়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা যায়। আর নিজের কাজের মাধ্যমে কিছু রেখে যেতে পারাটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। এই মানসিকতা আমি পরিবার থেকেই পেয়েছি। মা–বাবা, দিদা, আর আমার দাদা—তাঁরা কখনো হার মানতে শেখেননি। সেই জেদ আর অধ্যবসায় আমাদের সবার রক্তেই আছে। ব্যর্থতার গল্পও কম নয়—সিলিকন ভ্যালি থেকে যখন লস অ্যাঞ্জেলেসে যাই, তখন বাসাভাড়া দেওয়ার মতো টাকাও ছিল না। মা–বাবাও সেটা জানতেন না। যে অ্যাপার্টমেন্টে শেষ পাঁচ বছর ছিলাম, সেখানে—ফ্লোরেই ঘুমাতাম। শুধু কয়েক শ ডলার বাঁচানোর জন্য, যাতে সেই টাকা দিয়ে মিউজিক করতে পারি। তখন নিজের বানানো মিউজিক বিটস ১০০ থেকে ১৫০ ডলারে বিক্রি করতাম। টিকে থাকার জন্য অনেক কিছুই করেছি। এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, পুরো যাত্রাটাই ছিল অসাধারণ। তখন যেমন মিউজিককে ভালোবাসতাম, আজও ঠিক ততটাই ভালোবাসি।সঞ্জয় দেবছবি :প্রথম আলোপ্রথম আলো: শিগগিরই যদি বিশ্বের বড় কোনো মঞ্চে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়, কোন বাংলা গান শোনাতে চান।সঞ্জয় দেব : কার জন্য করিলা মায়া- এটাই শোনাব। এটা আমার বানানো সর্বশেষ বাংলা গান। এতে বাংলাদেশকে চিনতে পারবেন বিশ্বের মানুষ।প্রথম আলো : আপনি বিশ্বকাপের মঞ্চে পরিবেশনা দিয়ে সবাইকে আবেগপ্রবণ করেছেন। এমন কোনো গান, যা শুনলে আপনি আবেগপ্রবণ হন।সঞ্জয় দেব : হাবিব ওয়াহিদ ভাইয়ের রাত নির্ঘুম—চোখ ভেজে না কিন্তু কোথায় যেন হৃদয়টা নাড়িয়ে দেয়। কী অসাধারণ গান। এর বাইরে মালোমা আমার বেশ ভালো লাগে। আমি এই গানের শিল্পী সাগর দেওয়ানের একটা গান করেছি, কী অসাধারণ ভয়েজ। আমার কেন জানি মনে হয়, এসব প্রথম অধ্যায় ছিল—এখন থেকে খেলা শুরু হবে। বিশ্ব দেখবে বাংলা গান নতুন করে।সঞ্জয় দেবছবি :প্রথম আলোপ্রথম আলো: এমন কোনো স্বপ্নের কথা, যা কাউকে বলা হয়নি।সঞ্জয় দেব : আমার সব স্বপ্ন লিখে রাখি। নিজেকে প্রতিদিন বলতে থাকি। সবচেয়ে নতুন স্বপ্ন হচ্ছে, ঢাকায় আম্মা–আব্বাকে আমার শো দেখাতে চাই। তাঁদের আমার প্রতি দেশের মানুষের ভালোবাসা দেখাতে চাই। অবশ্য দেশের বাইরের দুটো অনুষ্ঠান দেখেছেন, কিন্তু নিজেদের দেশেরটা দেখুন।প্রথম আলো : আপনার প্লেলিস্টে এমন কী আছে, যা শুনলে অনেকে অবাক হতে পারে।সঞ্জয় দেব : ঘুম থেকে ওঠার পর নুসরাত ফতেহ আলীর গান অনেক শুনি। মানুষ ভাববে না, আমি কাওয়ালি টাইফ গান শুনি। রবিশঙ্করও শুনি—এক ঘণ্টা পর্যন্ত একটা গান চলতে থাকে—আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি। এটা মনোযোগ আটকে রাখে, একরকম মেডিটেশনও। মানুষ আমাকে দেখলে হয়তো ভাবে—আমি শুধু ক্লাব মিউজিকে মেতে থাকি। (হাসি)সঞ্জয় দেবছবি : প্রথম আলোপ্রথম আলো: সফলতা কি মানুষকে বদলে দেয়?সঞ্জয় দেব : এটা নির্ভর করে সফলতা ওই মানুষটার জন্য কী জিনিস, তার ওপর। আমার কাছে সফলতা হচ্ছে—অসাধারণ সব মিউজিক প্রডিউস করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। মানুষের মধ্যে আনন্দ বিলিয়ে দেওয়া, খুশি করা, ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া। আর এসব কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে একরকম উপহার। আমি শুধু সেই উপহারটা মানুষের মধ্যে বিলিয়ে যাচ্ছি।সঞ্জয় দেবছবি : মীর হোসেনপ্রথম আলো : ১০ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?সঞ্জয় দেব : শুনতে খুবই অদ্ভুত শোনাবে—তারপরও বলব, তত দিনে আমরা অস্কার, গ্র্যামি সবকিছু নিয়ে আসব বাংলাদেশে।প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুনআলাপন থেকে আরও পড়ুনযুক্তরাষ্ট্রসংগীত শিল্পীফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬বাংলাদেশ