যুদ্ধের সঙ্গে কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন ইরানি তরুণেরা
তেলের ডিপোতে বিমান হামলার কারণে কয়েক দিন ধরেই ইরানের রাজধানী তেহরানের আকাশ ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। আকাশ থেকে ঝরেছে কালো বৃষ্টি। তবে গত মঙ্গলবার দৃশ্যপট পুরো বদলে গিয়ে শহরের একটি অংশে তুষারপাত হয়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও ইরানের জনজীবন থমকে নেই।
তেহরানের বাসিন্দা বিশোর্ধ্ব তরুণী সাহার। বিবিসি পার্সিয়ানকে তিনি বলেন, দিনের বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই থাকছেন তিনি। রান্না করে, বই পড়ে এবং লাইফ সিমুলেশন ভিডিও গেম খেলে তাঁর সময় কাটে।
সাহার বলেন, ‘যুদ্ধের মধ্যে আমার সৃজনশীলতা যেন আরও বেড়ে গেছে। সারাক্ষণ একধরনের মানসিক চাপ কাজ করে। সেই ধকল সামলাতেই গেমের ভেতরে আমি এখন আগের চেয়ে আরও সুন্দর সব বাড়ি বানাচ্ছি।’
সাহারের আসল নাম এটি নয়। নিরাপত্তার খাতিরে বিবিসির এই প্রতিবেদনের অন্যান্য চরিত্রের মতো তাঁর নামও বদলে দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার সাহার জানতে পারেন, তাঁর সঙ্গে স্কুলে পড়া এক বান্ধবী যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন।
সাহার বলেন, ‘তাঁর (বান্ধবীর) মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি। খবরটা শোনার পর থেকে আমার খুব খারাপ লাগছে।’
সাহার আরও বলেন, ‘জীবনের এই সোনালি সময়ে কেন আমাদের এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে? আমি শুধু চাই—নওরোজের আগেই যেন সব শেষ হয়। বসন্তের শুরুর দিনগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় সময়।’
পারস্যের নববর্ষ উদ্যাপনের উৎসব নওরোজ শুরু হতে আর মাত্র ১০ দিন বাকি। এই উৎসবের মধ্য দিয়েই ইরানিরা বসন্তকে বরণ করে নেয়। সাধারণত এই সময়ে উৎসবের আমেজে মেতে ওঠে পরিবারগুলো। অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য মিষ্টি আর বাদাম কিনতে ইরানের বাজার আর রাস্তাঘাটে এখন মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকার কথা।
তবে তেহরানের বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, এবারের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন।
তেহরানের বাসিন্দা ত্রিশোর্ধ্ব পেমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘এবারের পরিস্থিতি দেখে মনেই হচ্ছে না, আর কয়েক দিন পর নওরোজ। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের মুখেও আমাদের জীবন চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায়ও নেই।’
পেমান আরও বলেন, ‘মেট্রো এখন প্রায় ফাঁকা। এতটাই জনশূন্য যে প্রতিজনের জন্য ৩০ থেকে ৪০টি করে আসন খালি পড়ে থাকে। রাস্তাঘাটও খুব শান্ত...এতটাই সুনসান যে রাস্তার মাঝখানেই অনায়াসে ফুটবল খেলা যাবে।’
তেহরানের ত্রিশোর্ধ্ব আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার ঘুমের সময়সূচি এখন পুরোপুরি বোমাবর্ষণের ওপর নির্ভর করে। আমি ভোর ছয়টা বা সাতটার দিকে ঘুমাতে যাই আর বেলা দুইটায় ঘুম থেকে উঠি। কখনো কখনো বাজার করতে বাইরে যেতে হয়, তবে তেহরান এখন একদমই জনশূন্য।’
তেহরান ও এর আশপাশের প্রদেশগুলোতে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের বাস। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেক বাসিন্দা শহর ছেড়েছেন। অনেকেই কাস্পিয়ান সাগরের তীরের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাগুলোর দিকে চলে গেছেন। কারণ, সেখানে হামলার তীব্রতা তুলনামূলক কম।
মিনার গল্পটাও একই রকম। ২০ বছর বয়সী এই তরুণী এখন রেশত শহরে অবস্থান করছেন।
স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মিনা বলছিলেন, ‘পরিবার থেকে বারবার রেশতে দাদির কাছে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু আমার প্রাণের বান্ধবী ও ফ্ল্যাটমেট তেহরান ছাড়তে রাজি ছিলেন না। ওকে একা রেখে চলে যেতে খুব অপরাধবোধ হচ্ছিল, তাই যেতে চাইছিলাম না।’
মিনা বলেন, ‘যে রাতে [তেলের] ডিপোতে হামলা হলো, আমাদের পুরো ফ্ল্যাট কেঁপে উঠেছিল। জানালায় এমন আলোর ঝলকানি দেখা গিয়েছিল, মাঝরাতেই মনে হয়েছিল সকাল হয়ে গেছে।’
মিনা আরও বলেন, ‘আমি সারাক্ষণ ভাবছিলাম, যদি আমার পরিবারের কোনো ক্ষতি হয়, তবে রেশতে না যাওয়ার জেদ ধরার জন্য আমিই দায়ী থাকব। পরদিন শেষমেশ রেশতের উদ্দেশে রওনা হই। যে গাড়ি করে যাচ্ছিলাম, তাতে তখনো সেই দূষিত বৃষ্টির দাগ লেগে ছিল।’
মিনা বলেন, ‘আমার সেই প্রিয় বন্ধুটি অবশ্য তার পরিবারের সঙ্গে তেহরানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আমি প্রতিদিন তাকে ফোন করি। যুদ্ধ শেষ হলে আমরা কত কী করব—সবই ফোনে আলাপ করি। হয়তো এই দুঃসময় কাটলে আমরা চুলে রঙ করব।’
যুদ্ধের শুরুতে ইরান সরকারের আরোপ করা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে দেশটির ভেতরে যোগাযোগ করা এখনো বেশ দুরূহ। তবে প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরা দমে যাননি; তাঁরা স্টারলিংকের ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন এবং অন্যদের সঙ্গেও সেই সংযোগ শেয়ার করছেন।
বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থা এখন ইরানের অনেকের কাছেই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তেহরানের বিশোর্ধ্ব তরুণ মেহরান বলেন, তিনি নিজের স্টারলিংক সংযোগ অন্তত ২৫ জনের সঙ্গে শেয়ার করছেন। কর্তৃপক্ষের নজরদারি এড়াতে বা সিগন্যাল ‘জ্যাম’ ঠেকাতে যন্ত্রটি তিনি ‘গোপন জায়গায়’ লুকিয়ে রেখেছেন। নিকটজনদের তিনি বিনা মূল্যেই এই সেবা ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছেন।
ইরানে মানুষের গড় মাসিক বেতন ২০০ থেকে ৩০০ ডলার। অথচ সেখানে টেলিগ্রাম অ্যাপে ১ গিগাবাইট (জিবি) ডেটা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬ ডলারে (৭০০ টাকার বেশি)।
তেহরানের আরেক তরুণী শিমাও ইন্টারনেটে যুক্ত থাকতে স্টারলিংক ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, ‘এটি বিশ্বাসযোগ্য মানুষের কাছ থেকে কিনতে হয়। নইলে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে যেকোনো সময় আপনার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ভয় থাকে।’
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস গতকাল বুধবার জানিয়েছে, ইরানে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ১২তম দিনে গড়িয়েছে। টানা ২৬৪ ঘণ্টা পর দেশটিতে ইন্টারনেটের সংযোগ এখন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে।
শিমা আক্ষেপ করে বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য অনেক চড়া দামে স্টারলিংক ভিপিএন কিনেছিলাম। কিন্তু সেটি চালু হতে অনেক বেশি সময় নেয়। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়—এত টাকা খরচ করা কি আদৌ সার্থক হলো? তবে অন্তত বিদেশে থাকা প্রিয়জনদের এটুকু তো জানাতে পারছি, আমি এখনো পুড়ে ছাই হয়ে যাইনি; এখনো বেঁচে আছি।’