যুক্তরাষ্ট্র–কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধ: ৭০০–এর বেশি মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করল অটোয়া
ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে শুল্ক আরোপের জেরে কানাডাও দেশটির বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়বে শত শত মার্কিন পণ্যের ওপর।
কানাডা সরকার গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ২৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বা ১৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন (১ হাজার ৯৯০ কোটি) মার্কিন ডলারের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করতে চলেছে।
ট্রাম্পের আরোপ করা নতুন শুল্কের বিপরীতে ‘ডলার-ফর-ডলার’ ভিত্তিতে এ পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে কানাডা। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যদি কানাডা থেকে আসা ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক বসায়, তবে কানাডাও ঠিক ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর সমান হারে বাড়তি শুল্ক বসাবে। কানাডার পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র যদি ১৫ শতাংশ, ২৫ শতাংশ বা ৫০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করে, কানাডাও ৭০০টির বেশি মার্কিন পণ্যে ঠিক একই হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে।
বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তার একটি নতুন পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে কানাডা সরকার।
সরকারের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, এ পাল্টা শুল্ক ৭০০টির বেশি মার্কিন পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে। এর আওতায় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি সরঞ্জাম, কৃষি যন্ত্রপাতি, পাল্প (মণ্ড) ও কাগজ, প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিকস খাত অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শুল্কের হার ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ হবে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে এ পাল্টা শুল্ক।
কানাডা সরকার নতুন শুল্কের কারণে সৃষ্ট আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার (৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের একটি নতুন তহবিল প্যাকেজও ঘোষণা করেছে।
গত সপ্তাহে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কানাডার ওপর নতুন বাড়তি শুল্ক আরোপ করেন। গত শনিবার কানাডীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের এ ঘোষণা দেন তিনি। ২০ বিলিয়ন (২ হাজার কোটি) ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর এর প্রভাবে পড়বে।
দুদিন পর গত সোমবার ট্রাম্প কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ি, ট্রাক, মোটর পার্টস বা গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইস্পাতের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ট্রাম্প কানাডাকে লক্ষ্য করে নানা কটূক্তিও করেছেন। মঙ্গলবার তিনি বলেন, কানাডার অন্টারিও প্রদেশের সীমান্তঘেঁষা গ্রেট লেকসের সবচেয়ে পূর্বের হ্রদ লেক অন্টারিওর নাম ‘লেক আমেরিকা’ রাখার কথা বিবেচনা করছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে ‘গভর্নর কার্নি’ বলেও উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের মন্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি করেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে দাবি করেন, এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর কানাডার কাছে ৬০ বিলিয়ন (৬ হাজার কোটি) ডলার করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যদিও কানাডার সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে কানাডার ৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার (৭ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) উদ্বৃত্ত রয়েছে।
এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে আল–জাজিরা হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রভাব শুধু কানাডার ওপর নয়, বরং মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের ওপরও পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি গাড়ির সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ফলে কানাডার চাহিদার ওপর নির্ভরশীল মার্কিন গাড়ি নির্মাতারা চাপের মুখে পড়তে পারেন।
এদিকে ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্কের কারণে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা ৫৫০টি ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে আইস স্কেট, টয়লেট পেপার, মদ ও রং। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাদের এসব পণ্যের জন্য বাড়তি অর্থ গুনতে হবে।
অর্থনৈতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে মার্কিন নাগরিকদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। শুল্কের আর্থিক বোঝার ৯৬ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারক ও ভোক্তারা বহন করবেন।