বাংলাদেশ

২৫ টাকার বিদ্যুতে ৮০ কিলোমিটার যাবে বাইক, সূর্যের আলোতেই চলবে ‘সানকার’

September 13, 2026
1 month ago
By SAJ
২৫ টাকার বিদ্যুতে ৮০ কিলোমিটার যাবে বাইক, সূর্যের আলোতেই চলবে ‘সানকার’

অটোরিকশার মতো দেখতে ছোট্ট একটি যান। নাম ‘সানকার’। এর পুরো ছাদজুড়ে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল। একই রকম প্যানেল আছে পেছন দিকেও। দিনের বেলা চলবে সূর্যের আলোতেই। আর বাড়তি বিদ্যুৎ জমা হবে ব্যাটারিতে। সন্ধ্যার পরও এটি চলবে সেই ব্যাটারির শক্তিতে।

আজ রোববার সকালে রাজধানীর নভোথিয়েটার প্রাঙ্গণে শুরু হওয়া ইনোভেশন ফেয়ারে ঘুরতে গিয়ে এমন নানা উদ্ভাবনের দেখা মিলল। কোনোটি পরিবেশবান্ধব পরিবহনের কথা বলছে, কোনোটি আবার আকাশে উড়তে থাকা ড্রোন ঠেকানোর প্রযুক্তি নিয়ে হাজির হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এসব উদ্ভাবন দেখতে মেলায় ভিড়ও ছিল বেশ।

সৌরবিদ্যুৎ–চালিত ‘সানকার’টি তৈরি করেছে বরিশালে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি)। মেলার মূল স্টলের সামনেই সেটি প্রদর্শিত হচ্ছে। দেখা গেল, এটি মূলত তিন আসনের একটি পরিবেশবান্ধব বাহন। চার চাকার এই বাহনের ছাদে ৪০০ ওয়াট এবং পেছনে ২০০ ওয়াটের সৌরপ্যানেল রয়েছে।

বাহনটি সম্পর্কে ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের অটোমোবাইল বিভাগের প্রধান মো. সাগর প্রথম আলোকে বলেন, এটি চলার সময় বা থেমে থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ তৈরি হলে তা ব্যাটারিতে জমা হবে। সূর্যের আলো না থাকলে সেই ব্যাটারি থেকে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বাহনটি চলতে পারবে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমবে।

মেলায় যে বাহনটি আনা হয়েছে সেটি তিন আসনের। তবে ভবিষ্যতে মডেল পরিবর্তন করে ছোট পরিবারের উপযোগী গাড়ি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে উদ্ভাবকদের।

বর্তমানে গাড়ির প্রোটোটাইপটি তৈরি করতে খরচ পড়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ টাকার মতো। তবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারলে দাম আরও কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে উদ্ভাবকদের।

গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬–এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিন দিনব্যাপী এই মেলার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘ইনোভেট টু মার্কেট’। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই মেলায় সরকারি-বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, ৭৩টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, স্বতন্ত্র গবেষক, শিক্ষার্থী, নতুন স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান(এসএমই) এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা অংশ নিয়েছে।

মেলা ঘুরে দেখা গেছে প্রযুক্তি, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতের এক হাজারের বেশি নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন সেখানে প্রদর্শিত হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি মেলায় ঘুরতে এসেছেন নানা শ্রেণি পেশার মানুষও। রাজধানীর মিরপুর থেকে এসেছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আনজুমান মেহজাবিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্টল আছে, সেটি দেখতে এসেছি। পাশাপাশি রোবট, গেমসসহ নতুন নতুন অনেক কিছুই দেখলাম।’

বেসরকারি চাকরিজীবী সানাউল্লাহ এসেছেন তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। তিনি বলেন, বাচ্চাদের বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী করতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও নেওয়া উচিত।

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের গবেষকেরা তৈরি করেছেন ইলেকট্রিক বাইকের মোটর।

চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্প ও ঢাকার ধোলাইখাল থেকে কম দামে সংগ্রহ করা পুরোনো ৪৪০ ভোল্টের ইন্ডাকশন মোটরকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করে সেটিকে ৬০ ভোল্টে রূপান্তর করা হয়েছে। এর সঙ্গে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার স্থানীয় কপার কয়েল ব্যবহার করে এই মোটর বানানো হয়েছে। খরচ পড়েছে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে।

গবেষকদের দাবি, মোটরটি মাত্র ৩০ মিনিট ফাস্ট চার্জে প্রায় ৮০ কিলোমিটার চলতে পারবে বাইকটি। এই ৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে বিদ্যুতের খরচ পড়বে আনুমানিক ২৫ টাকা।

ইইই বিভাগের গবেষক ইমতিয়াজ আবেদিন প্রথম আলোকে বলেন, বাইকের কন্ট্রোলারও তাদের নিজেদের তৈরি। সব মিলিয়ে এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে গেলে বাইকটির দাম ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকার মধ্যে রাখা সম্ভব।

ইন্টারসেপ্টর ব্যাগ্রো লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি মেলায় নিয়ে এসেছে আকাশে ড্রোন ঠেকানোর প্রযুক্তি। একজন দর্শনার্থীকে হাতে তুলে দেওয়া হলো দেখতে অনেকটা বন্দুকের মতো একটি যন্ত্র। সেটির সঙ্গে যুক্ত আছে একটি ড্রোন। সামনে থাকা স্ক্রিনে ড্রোনের ক্যামেরায় দেখা দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে।

উদ্ভাবক জানালেন, এটি একটি ‘অ্যান্টি-ড্রোন ইন্টারসেপ্টর’, অর্থাৎ ড্রোন শনাক্ত করে সেটিকে প্রতিহত করার জন্য তৈরি একটি ব্যবস্থা। এটির নাম দিয়েছে ‘উল্কা’।

প্রদর্শিত ব্যবস্থাটিতে ড্রোনের ক্যামেরার দৃশ্য সরাসরি ডিসপ্লেতে দেখা যায়। নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে স্ক্রিনের ক্রস চিহ্নের মধ্যে রেখে নির্দেশ দিলে সেটিকে লক্ষ্য করে ইন্টারসেপ্টর ড্রোন পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে লক্ষ্য শনাক্ত ও অনুসরণ করার ব্যবস্থাও যুক্ত করার কথা জানালেন উদ্যোক্তা।

উদ্যোক্তা এস এম ইশতিয়াকের ভাষ্য, বর্তমান সেটআপে এর কার্যকর দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফুট। তবে এটি চূড়ান্ত সীমা নয়। আরও অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করা গেলে এর রেঞ্জ ও আকাশে থাকার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব বলে দাবি উদ্যোক্তার।