বাংলাদেশ

সংকট শুধু পরিকল্পনার নয়, কল্পনারও

November 5, 2026
3 minutes ago
By SAJ
সংকট শুধু পরিকল্পনার নয়, কল্পনারও

বাংলাদেশের শহরগুলো নিয়ে আমাদের আলোচনা সাধারণত কিছু পরিচিত সমস্যার মধ্যেই ঘুরপাক খায়—যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসনসংকট, ফুটপাত দখল, নাগরিক সেবার অপ্রতুলতা ইত্যাদি। আমরা সমস্যা চিহ্নিত করি, বিশেষজ্ঞদের ডাকি, পরিকল্পনা করি, প্রকল্প হাতে নিই। তারপরও সংকট থেকে যায়। একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে প্রায়ই আরেকটি সমস্যার জন্ম দিই। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, সমস্যাটি শুধু আমাদের পরিকল্পনার ঘাটতিতে নয়?

আমার মনে হয়, বাংলাদেশের নগর সংকটের গভীরে রয়েছে নগর-কল্পনার সংকট। আমরা কেমন শহর চাই, সেই শহর কার, কার জীবনকে কেন্দ্র করে তার পরিকল্পনা হবে, প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক কী হবে—এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আমাদের সম্মিলিত কল্পনা অত্যন্ত সীমিত। এই সীমাবদ্ধতার শিকড় রয়েছে আমাদের ইতিহাস ও নগরায়ণের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্যে।

নদীমাতৃক থেকে নগরসভ্যতা

আমাদের এই ভূখণ্ডের সভ্যতার ইতিহাস রোমের মতো একক, কেন্দ্রীভূত নগরকে ঘিরে গড়ে ওঠেনি। বাংলার বসতি ও নগরায়ণের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর নদীনির্ভর, বিস্তৃত ও বহুকেন্দ্রিক চরিত্র। নদী, খাল, বিল, জলাভূমি, কৃষিজমি এবং মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের বসতি ও অর্থনৈতিক জীবন নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত ছিল। আমাদের ভূগোল এমন এক সভ্যতার জন্ম দিয়েছে, যেখানে মানুষের জীবন সব সময় কোনো একটি বিশাল নগরের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।

মোগল আমলে ঢাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। সেই নগরায়ণ ইউরোপীয় আধুনিক নগর-পরিকল্পনার মতো কোনো সর্বব্যাপী নকশার অনুসরণে ঘটেনি। প্রশাসনিক স্থাপনা, দুর্গ, বাজার, মহল্লা, ঘাট, নদীপথ ও সাধারণ মানুষের বসতি মিলিয়ে নগর বিকশিত হয়েছিল। নগরের বিভিন্ন অংশের বিকাশের পেছনে ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডেরও বড় ভূমিকা।

কলকাতায় ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিস্তারে ঢাকার অবস্থান বদলে যায়। শহর ধীরে ধীরে এমন একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, যাকে ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, শৃঙ্খলায় আনতে হবে, উন্নত করতে হবে। এই উন্নয়নের ধারণার মধ্যেই নিহিত ছিল এক গভীর রাজনৈতিক প্রশ্ন—কার জন্য উন্নয়ন?

ঔপনিবেশিক নগর-কল্পনার দীর্ঘ ছায়া

ঔপনিবেশিক নগরায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল স্থানিক বিভাজন। একদিকে শাসকগোষ্ঠী ও প্রশাসনিক অভিজাতদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা, উন্নত অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বসতি, বাজার ও শ্রমজীবী এলাকার জন্য ভিন্ন বাস্তবতা। ঢাকায় রমনা ও মিন্টো রোডকে কেন্দ্র করে ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক আবাসিক এলাকার বিকাশ এই ইতিহাসের একটি উদাহরণ। শহরের ভেতরেই যেন আরেকটি পৃথক শহর, যেখানে পরিকল্পনা, পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধার মান আশপাশের অঞ্চল থেকে আলাদা।

১৯১৭ সালে প্যাট্রিক গেডেস ঢাকার নগর-পরিকল্পনা বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেন। তাঁর চিন্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল শহরের বিদ্যমান প্রকৃতি, জলাভূমি, সবুজ ও সামাজিক জীবনকে বিবেচনায় নেওয়া। তাঁর কাজকে তাই সরলভাবে ঔপনিবেশিক বিভাজনের সমার্থক বলা যাবে না। কিন্তু যে শাসনব্যবস্থার অধীনে নগর–পরিকল্পনার এই চর্চা চলছিল, তার মধ্যেই প্রশাসনিক ক্ষমতা ও সাধারণ নগরজীবনের মধ্যে সুস্পষ্ট দূরত্ব ছিল।

পাকিস্তান আমলে ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়; ১৯৫৯ সালে মিনোপ্রিও, স্পেন্সলি ও ম্যাকফারলেনের মহাপরিকল্পনার মধ্য দিয়ে শহরের বিভিন্ন অংশকে আলাদা আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চল হিসেবে বিন্যস্ত করার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী ইত্যাদি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার বিকাশকে এই বৃহত্তর ইতিহাসের মধ্যে দেখতে হবে।

এসব এলাকার পরিকল্পনা করা ভুল ছিল, এমন নয়। প্রশ্ন হলো, কেন শহরের কিছু নির্দিষ্ট অংশ পরিকল্পিত নাগরিক সুবিধার অধিকারী হবে, আর অন্যান্য অংশের মানুষকে নিজেদের উদ্যোগে বসতি, রাস্তা, পানি কিংবা পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে নিতে হবে?

ধানমন্ডির পাশে কলাবাগান কিংবা কাঁঠালবাগানের মতো এলাকার বিকাশের দিকে তাকালেই এই পার্থক্য বোঝা যায়। এসব এলাকার মানুষের নিজস্ব উদ্যোগ, স্থানীয় সংগঠন ও দৈনন্দিন প্রয়োজন শহর গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় সব এলাকার মানুষ সমান মনোযোগ বা সম্পদ পায়নি।

অর্থাৎ আমরা এমন এক নগর-পরিকল্পনার ধারায় অভ্যস্ত হয়েছি, যেখানে শহরের কিছু অংশকে পরিকল্পনার বিষয় হিসেবে দেখা হয়, আর বাকি অংশকে সমস্যা।

পরিকল্পিত দ্বীপ, অপরিকল্পিত সমুদ্র

স্বাধীনতার পরও এই চিন্তার মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। আমরা নতুন নতুন পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, উপশহর ও নগর সম্প্রসারণ প্রকল্প তৈরি করেছি। পূর্বাচল তার একটি বড় উদাহরণ। বিশাল আয়তনের এই পরিকল্পিত নতুন শহরে রাস্তা, প্লট, আবাসন ও বিভিন্ন নাগরিক সুবিধার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু পূর্বাচলকে যদি তার চারপাশের গ্রাম, বিদ্যমান বসতি, কৃষিজমি, জীবিকা, নদী ও জলাভূমির বৃহত্তর বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়, তাহলে আমরা আবারও সেই পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করব।

আজ যে গ্রামগুলো প্রকল্পের সীমানার বাইরে, নগরায়ণের চাপে সেগুলো আগামী দিনে অপরিকল্পিতভাবে বদলে যাবে। মানুষ সেখানে আরও বসতি গড়বে, আরও দোকান তৈরি করবে, কর্মসংস্থান ও যাতায়াতের নতুন নতুন ব্যবস্থা তৈরি হবে। তারপর একসময় আমরা বলব, পরিকল্পিত শহরের পাশে আবার এত ‘অপরিকল্পিত’ বসতি কেন?

এভাবে আমরা যেন বারবার পরিকল্পিত কিছু দ্বীপ তৈরি করছি, যার চারপাশে বিশাল এক অপরিকল্পিত সমুদ্র। সমুদ্রকে বাদ দিয়ে দ্বীপগুলোর পরিকল্পনা করছি। এটি কেবল পরিকল্পনার পদ্ধতিগত সমস্যা নয়; শহরকে দেখার একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি।

শহর আসলে কাদের

এই প্রশ্ন স্পষ্ট হয় আমাদের নাগরিক সুবিধার বণ্টনের দিকে তাকালে। গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো এলাকায় নাগরিক পরিষেবার বিষয়ে যে ধরনের মনোযোগ দেখা যায়, জুরাইন কিংবা শহরের বহু নিম্ন আয়ের এলাকায় আমরা তা দেখি না। যেন শহরের কিছু মানুষ উন্নত নাগরিক জীবন পাওয়ার স্বাভাবিক দাবিদার, আর অন্যদের ভাগ্যে থাকবে জলাবদ্ধতা, দূষণ, অনিরাপদ আবাসন কিংবা অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবা।

অথচ যে মানুষটি সকালে শহরের রাস্তা পরিষ্কার করেন, বাস চালান, নির্মাণশ্রমিক হিসেবে বহুতল ভবন নির্মাণ করেন, ফুটপাতে খাবার বিক্রি করেন, বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন, তাঁরা প্রত্যেকেই শহরের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। শহরের পরিকল্পনায় তাঁরা কোথায়?

আমরা প্রায়ই শহরের মানুষকে বৈধ ও অবৈধ, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক, পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিত—এ ধরনের বিভাজনে দেখি। অবশ্যই শহর পরিচালনায় নিয়মকানুন প্রয়োজন। কিন্তু কোনো মানুষের বসতি বা জীবিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকলেই তাঁর মৌলিক নাগরিক প্রয়োজন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না।

শহরের সাফল্য কি তার সবচেয়ে ধনী বাসিন্দাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিচার করা হবে, নাকি সবচেয়ে প্রান্তিক বাসিন্দাদের জীবনের মান দিয়ে? আমাদের নগর–পরিকল্পনার চিন্তা এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া জরুরি।

প্রকৃতি কি শহরের বাইরে

আমাদের নগর-কল্পনার আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা শহর ও প্রকৃতিকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে ভাবতে শিখেছি। আমাদের প্রচলিত চিন্তায় গ্রাম প্রকৃতির স্থান, আর শহর মানুষের নির্মিত কৃত্রিম পরিবেশ।

এই বিভাজনে আধুনিক নগরায়ণে প্রকৃতিকে প্রায়ই উন্নয়নের প্রতিবন্ধক কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক বদ্বীপে এই চিন্তা বিপজ্জনক। ঢাকার খাল, জলাভূমি, নদী, গাছপালা, উন্মুক্ত ভূমি এ শহরেরই অংশ। এগুলো ছাড়া শহরের পানি, তাপমাত্রা, জীববৈচিত্র্য, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক জীবনকে টেকসই রাখা সম্ভব নয়।

জলাভূমি ভরাট করে আবাসন তৈরির সময় আমরা শুধু প্রকৃতিই ধ্বংস করি না, শহরের পানি ধারণের ক্ষমতাও কমিয়ে দিই। খালকে নর্দমায় পরিণত করলে শুধু পরিবেশেরই ক্ষতি হয় না; শহরের জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ে। প্রকৃতির ক্ষতি আর মানুষের ক্ষতি আলাদা নয়।

আমাদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি রয়েছে। রয়েছে ভূমিকম্প, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য দুর্যোগের আশঙ্কা। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনগুলোতে শহরগুলোর ওপর জনসংখ্যার চাপ বাড়তে পারে।

এই বাস্তবতায় আমাদের শহরগুলোকে সহনশীল করতে হবে। এটি কেবল শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়; একটি সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন। আমাদের ভাবতে হবে, কীভাবে শহরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ ও সবচেয়ে বিপন্ন প্রতিবেশব্যবস্থাকে একই সঙ্গে পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনা যায়। কারণ, প্রান্তিক মানুষের জীবন ও প্রকৃতির সুরক্ষা শহরের অর্থনীতির বিপরীত কোনো বিষয় নয়; বরং দীর্ঘ মেয়াদে একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও টেকসই নগর অর্থনীতির পূর্বশর্ত।

আগে প্রয়োজন নতুন কল্পনা

আমরা শহরের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রায়ই বিশেষজ্ঞদের দিকে তাকিয়ে থাকি। যানজট হলে সড়কবিশেষজ্ঞ, জলাবদ্ধতা হলে প্রকৌশলী, আবাসনসংকট হলে স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ, দূষণ হলে পরিবেশবিশেষজ্ঞ। প্রত্যেকে নিজের ক্ষেত্রের মধ্যে সমাধান খোঁজেন।

এসব বিশেষজ্ঞ জ্ঞান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হলো, শহরকে আমরা আলাদা আলাদা সমস্যার সমষ্টি হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। অথচ শহর একটি সম্পর্কের জগৎ। মানুষ, প্রকৃতি, অবকাঠামো, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতি পরস্পরকে প্রভাবিত করে। একটিকে অন্যটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।

আমরা হকার উচ্ছেদ করে ফুটপাত পরিষ্কার করতে পারি। কিন্তু হকারদের জীবিকার প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যায়। আমরা একটি এলাকায় জলাবদ্ধতা কমাতে পানি অন্য এলাকায় ঠেলে দিই। আমাদের তৈরি নতুন পার্ক যদি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য কার্যত সংরক্ষিত থাকে, তাহলে সেটি কতটা সর্বজনীন? এই প্রতিটি সমস্যার পেছনে অভিন্ন প্রশ্ন হলো: শহর আমরা কার জন্য নির্মাণ করছি?

আমাদের শহরের ভবিষ্যৎ তাই কেবল আরেকটি মহাপরিকল্পনা, নতুন আইন বা উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে আমরা শহর সম্পর্কে কতটা নতুনভাবে চিন্তা করতে পারি, তার ওপর। নতুন চিন্তার জন্য প্রয়োজন শহরকে কেবল প্রশাসনিক সীমানা বা উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি সম্মিলিত জীবনব্যবস্থা হিসেবে কল্পনা করা দরকার; যেখানে ধনী-দরিদ্র, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবী, নারী-শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষ—সবাই নগরজীবনের সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেখানে নদী, জলাভূমি, গাছপালা ও অন্যান্য প্রাণের অস্তিত্বও পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। এ ক্ষেত্রে সরকার নাগরিক সমাজ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, শিল্পী, উদ্যোক্তা—সবারই ভূমিকা আছে। আমাদের পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখাগুলো অতিক্রম করতে হবে। শুধু স্থপতিরা স্থপতিদের সঙ্গে, পরিকল্পনাবিদেরা পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে কিংবা পরিবেশবিদেরা পরিবেশবিদদের সঙ্গে কথা বললে চলবে না। যাঁদের জীবনকে কেন্দ্র করে শহরের পরিকল্পনা, সেই সাধারণ মানুষদেরও এই আলোচনার সক্রিয় অংশীদার করতে হবে।

আমাদের নগর-ইতিহাসে উত্তরাধিকার হিসেবে যে বিচ্ছিন্নতা ও বৈষম্য এসেছে, তা অনিবার্য ভবিষ্যৎ নয়। আমরা চাইলে অন্যভাবে শহর গড়ার চিন্তা করতে পারি। কিন্তু তার জন্য স্বীকার করতে হবে যে শহর সবার। এটি কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়, বরং নগরজীবনের মৌলিক নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি। আমাদের শহরগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট এই যে আমরা এখনো যথেষ্ট গভীরভাবে কল্পনাই করতে পারিনি, একটি শহর সত্যিকার অর্থে সবার হলে সেটি কেমন হতে পারে।

সেই কল্পনা করার সম্মিলিত সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের শহরগুলোর ভবিষ্যৎ।

* তানজিল শফিক: নগর–গবেষক; শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ড, যুক্তরাজ্য