বিদেশে পলাতক ফয়সাল করিমের ভিডিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের যে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
সাজ্জাত আলী আজ শনিবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘ক্র্যাব বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’ অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান। অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন।
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা ফয়সাল করিম ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে ইতিপূর্বে পুলিশ জানিয়েছিল। তবে ভিডিওতে ফয়সাল দাবি করেছেন, তিনি এখন দুবাইয়ে রয়েছেন। তিনি ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় গুলি করা হয় তাঁকে। মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত তাঁকে গুলি করে পালিয়ে যায়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল। গত ১৮ ডিসেম্বর সেখানে তিনি মারা যান।
ওসমান হাদিকে গুলিবর্ষণকারী হিসেবে ফয়সাল করিমকে চিহ্নিত করে পুলিশ। তবে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ফয়সাল এবং হামলার সময়ে তাঁর সঙ্গে মোটরসাইকেলে থাকা আলমগীর শেখ ভারতে পালিয়েছেন বলে গত ২৮ ডিসেম্বর জানিয়েছিল পুলিশ।
এরপরই ফয়সাল করিমের ভিডিও আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওটি আসল বলে এরই মধ্যে ফ্যাক্ট চেকাররা নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি দুবাইয়ে রয়েছেন বলে দাবি করলেও এর সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফয়সালের ভিডিওর বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে শেখ মো. সাজ্জাত আলী শুরুতেই বলেন, ‘নো কমেন্টস।’ পরে তিনি যোগ করেন, ভিডিওটা তাঁরা পরীক্ষা–নিরীক্ষা করছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বক্তব্য দেবেন।
হাদি হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ফয়সালের বাবা–মা, স্ত্রীসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়া চারজন সাক্ষীও আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে বর্তমান প্রার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে, অনেকেই চাচ্ছেন। আমাদের রিসোর্স, সক্ষমতার দিকেও তাকাতে হচ্ছে। এখন আপনার (প্রার্থীর) জীবনে কতটা হুমকি আছে, সেটি বিশেষ পুলিশ (এসবি) দিয়ে যাচাই করছি। যাচাইয়ের পর এসবি যখন বলে যে ইয়েস, এক্স, ওয়াই, জেড–এর জীবনের নিরাপত্তাঝুঁকি আছে, তখন আমরা গানম্যান দিচ্ছি।’
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর অনেক প্রার্থী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা পুলিশকে জানিয়েছিলেন। তারপর বেশ কয়েকজনকে বন্দুকধারী দেহরক্ষী দেওয়া হয়।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ভবিষ্যতেও কোনো প্রার্থী বা ওরকম কোনো ব্যক্তি যদি জীবনের নিরাপত্তা বা ঝুঁকির কথা আমাদের বলেন, যাচাই করে দেখে আমরা গানম্যান দিতে প্রস্তুত। তবে সব সময় মনে রাখবেন, আমাদের গরিব দেশ, গরিব পুলিশ ডিপার্টমেন্ট, আমাদের নির্বাচন হলো টপ প্রায়োরিটি। আমি যদি সব লোকবল এ ধরনের কাজেই নিয়োগ করি, তাহলে আমার ভোটকেন্দ্র কে পাহারা দেবে? আমার ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়াটা, তারপর মাস্তানি–সন্ত্রাসীসহ নানা ধরনের ভোটের যে জটিলতা আছে, এগুলোকে আমাকে প্রায়োরিটি দিতে হচ্ছে। তাই আমরা সব দিকে ব্যালান্স করে রিসোর্সের দিকে তাকিয়ে কতটুকু কী সম্ভব, সেটা করার চেষ্টা করছি।’
পেরিয়ে আসা ২০২৫ সালকে অশান্ত বছর আখ্যায়িত করে শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, ‘চব্বিশ সাল ছিল জুলাই আন্দোলন, কিন্তু তার প্রভাবে গত বছর এ দেশের ইতিহাসে খুবই টার্বুলেন্ট (অশান্ত) একটা বছর ছিল। শত শত ক্রাউড কন্ট্রোল, নানা গোষ্ঠীর দাবি–দাওয়া নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঢাকাবাসীকে রাস্তায় বসে থাকার ঘটনা ঘটেছে। যেটা খুবই দুঃখজনক। রাস্তা অবরোধ না করতে বহুবার অনুরোধ করার পরও কেউ শোনেননি। আমাদের এ ধরনের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা খুবই জরুরি। আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার, সেটি গণতান্ত্রিক উপায়ে হোক। এই ভঙ্গুর ট্রাফিকের শহরে রাস্তা অবরোধ হলে মানুষের দুর্ভোগের কোনো শেষ থাকে না।’
সাংবাদিকদের উদ্দেশে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘১৪ মাস ধরে আমি ডিএমপি কমিশনারের দায়িত্ব পালন করছি। আমার অন্য সহকর্মীদের বিষয়ে আপনারা লিখবেন কি না জানি না, তবে এই সময়ে আমার কটি ভুল হয়েছে, সেটি নিয়ে লিখলে আমি খুশি হব।’
ওসি রদবদল নিয়ে শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে পুলিশে লটারির মাধ্যমে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। পুলিশের মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ একটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এখানে ভোলার তজুমদ্দিন থানার ওসিকে নিয়ে এসে গুলশানের ওসি করলে সে পারে না। সে তখন বিল্ডিংয়ের কত তলা, সেটা গোনে। মেয়েটা মোজা পরছে, নাকি তার চামড়াই এ রকম, এইটা দেখে। তাই এ রকম অবস্থার ভেতরে মফস্সল থেকে একজন অফিসার নিয়ে এসে মোহাম্মদপুরের ওসি করলে মাথা ঘোরে।’
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘তারপরও আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে মফস্সল থেকে আনলে আপনাদেরই অসুবিধা হবে। ঢাকার ওসি যাঁরা ছিলেন, কিছু বাদ দিয়ে তাঁদের মধ্য থেকেই লটারি করে ওসি করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, যিনি সবুজবাগ থানায় ছিলেন, তাঁর ভাগ্যে যদি মোহাম্মদপুর পড়ে থাকে, তাহলে সবুজবাগের অফিসার হিসেবে যে ধরনের কন্ট্রোল ক্যাপাসিটি থাকা দরকার, সেটি দিয়ে মোহাম্মদপুরে চলে না। তাই এই অসুবিধার মধ্যেও আমার অফিসাররা কাজ করে যাচ্ছেন।’
বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ছিনতাই কম, সব দিক দিয়ে অপরাধ কম আছে। আগামী দিনেও যেন আমরা ধরে রাখতে পারি, সেটির জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আগামী ৪০ দিন যদি আমরা আইনশৃঙ্খলা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি, তাহলে নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হবে। আমাদের কাছে এখন টপ প্রায়োরিটি জাতীয় নির্বাচন। জানুয়ারি মাসের ২১ বা ২২ তারিখের থেকে সম্ভবত ক্যাম্পেইন শুরু হবে। তখনই সবচেয়ে বড় জটিলতা হওয়ার কথা। নানা অভিযোগ আসবে। তবে নির্বাচনই এখন আমাদের মুখ্য বিষয়।’