বড় ভাই এক সপ্তাহ আগে মারা গেছে, এখন পর্যন্ত একনজর দেখতেও পারিনি
২৮ ফেব্রুয়ারি ইফতার করে বসেছিলাম। হঠাৎ বড় ভাইয়ের রুমমেটের ফোন। তিনি যা বললেন, শুনে আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। আবদুল্লাহ নামের একজন নাকি তাঁকে ফোন করে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় আমার ভাই মারা গেছেন, তিনি নিজেও আহত হয়ে পড়ে আছেন। খবরটা দিয়ে নাকি নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন তিনি।
কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। একটু আগেই যে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেটার সঙ্গে যে আমার ভাইয়ের নামও জড়িয়ে যাবে, কল্পনাও করিনি।
আমরা তিন ভাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান শহরে থাকি। একই শহরে থাকলেও আলাদা এলাকায় বাস। দুর্ঘটনার সময়ও আমি দূরেই ছিলাম। খবর পাওয়ার ২০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাই। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ, আমার বড় ভাই আর বেঁচে নেই। ভাইয়ের মরদেহ আর দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এখন (৩ মার্চ, সন্ধ্যা) পর্যন্ত ভাইকে একনজর দেখতেও পারিনি।
আমার ভাইয়ের নাম সালেহ আহমদ। এখানে সবাই তাঁকে আহমদ আলী নামে চিনতেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি আজমান শহরে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মারা গেছেন আমার ভাই। গাড়ি চালানোর কাজ করতেন তিনি। ইফতারের পর পানির গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলেন। সেই গাড়িতেই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে। যুদ্ধে কোনো পক্ষের মানুষ না হয়েও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের শিকার হলেন আমার ভাই।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার গাজিটেকা (বাঁশতলা) গ্রামে আমাদের বাড়ি। জীবিকার সন্ধানে প্রায় ৩৫ বছর আগে আরব আমিরাতে আসেন ভাই। তাঁর হাত ধরেই ২০০৪ সালে আমি আসি। এরপর আসে ছোট ভাই বোরহান উদ্দিন। বড় ভাইয়ের মতো আমিও গাড়ি চালাই।
দুর্ঘটনার আগপর্যন্ত আজমানে তেমন কোনো আতঙ্ক ছিল না। সবকিছু স্বাভাবিক চলছিল। শুনছিলাম, আবুধাবি, দুবাই—এসব স্থানে কিছু হতে পারে। কিন্তু আজমানে সে রকম কিছু আন্দাজ করা যায়নি। মিডিয়াতেও তেমন কিছু আসছে না। অন্য কোথায় কী হচ্ছে, সেটাও জানার সুযোগ নেই।
ওপর ওপর আজমানের জীবনযাত্রা এখনো স্বাভাবিক। দোকানপাট খোলা, যানবাহন চলছে, মানুষও প্রয়োজনমতো চলাফেরা করছে। বড় কোনো সমস্যা চোখে পড়ছে না। তবে আমরা শারজাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি থাকি। এই ঘটনার পর থেকে সেখানে বিমান ওঠানামা চোখে পড়ছে না। ফ্লাইট বন্ধ। রাস্তায় যানবাহন চললেও আগের চেয়ে কম। রাতে মাঝেমধ্যে বিকট শব্দ শুনি। শব্দের উৎস কী, বলতে পারি না।
একধরনের অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ, আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠার ভেতর দিয়ে সময় পার করছি। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও আমাদের ভেতরে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা কাজ করছে। কখন কী হয়, এই শঙ্কা নিয়ে দিন কাটছে।
ভাইয়ের মৃত্যুর পর ছোট ভাই বাংলাদেশ দূতাবাস ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে, এখনো জানি না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং লাশ হস্তান্তর করা হলে আমরা দুই ভাই মিলে বড় ভাইয়ের লাশ নিয়ে দেশে ফিরব।
চার মাস আগে শেষবার দেশে গিয়েছিলেন বড় ভাই। দেশে ভাবি আছেন, তাঁদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে।
তাদের সামনে কীভাবে দাঁড়াব, ভাবতেই পারছি না।
অনুলিখন: আকমল হোসেন