ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মুনাফার একাংশ সমাজের জন্য ব্যয় করতে হবে
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মুনাফার একটি অংশ সমাজের জন্য ব্যয় করতে হবে। হারটি হবে কর-পূর্ব মুনাফার ১ শতাংশ। কেউ চাইলে বেশিও ব্যয় করতে পারবে।
সামাজিক দায়বদ্ধতায় (সিএসআর) ব্যয় বাধ্যতামূলক করতে একটি নীতিমালা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নীতিমালার খসড়ায় এ কথা বলা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতার কার্যক্রমকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনতে চায় সরকার। এর অংশ হিসেবেই নীতিমালা করা হচ্ছে।
দেশে এখন কিছু খাতের জন্য সিএসআরে ব্যয় বাধ্যতামূলক। যেমন মোবাইল অপারেটরকে মোট আয়ের ১ শতাংশ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলে জমা দিতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সাল থেকেই সিএসআর কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করতে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করে আসছিল। ২০২২ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সিএসআর নীতিমালা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা এখনো বহাল। নীতিমালায় ব্যাংকের জন্য নির্দিষ্ট কোনো হার বলে দেওয়া হয়নি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সিএসআরকে উৎসাহ দিতে এ খাতে ব্যয় করা অর্থে কর ছাড় দিয়েছে ২০১০ সালে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যে নতুন নীতিমালা করছে, সেখানে সবার জন্যই সিএসআর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, নীতিমালার আওতায় পড়বে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি। এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন বা সরকারনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি বা বহুজাতিক কোম্পানি এবং নির্ধারিত আর্থিক সীমার বেশি ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠান।
কোন প্রতিষ্ঠান সিএসআর নীতিমালার আওতাভুক্ত হবে এবং তাদের আর্থিক সীমা কত হবে, তা নির্ধারণ করা হবে ২০২২ সালের জাতীয় শিল্পনীতি অনুযায়ী। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চূড়ান্ত নীতিমালায় নতুন প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য কিছুটা ছাড় থাকবে।
জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির গতকাল শনিবার রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করে মতামত নেওয়ার পর চূড়ান্ত খসড়া তৈরি হবে। এরপর তা অনুমোদনের জন্য যাবে মন্ত্রিসভায়। তিনি বলেন, বাস্তবতার বাইরে গিয়ে কিছু করা হবে না।
নীতিমালা হবে আপাতত পাঁচ বছরের জন্য। এরপর তা পর্যালোচনা করা হবে। খসড়া অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিবছর সিএসআর খাতের সার্বিক দিক নিয়ে একটি করে বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। নির্ধারিত অর্থ পুরোপুরি ব্যয় না হলে তার কারণ, পরিমাণ এবং ব্যবহারের পরিকল্পনা বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে পরের অর্থবছরে ব্যবহার করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিজেই সিএসআর খাতের সার্বিক বিষয়ে প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। খসড়া অনুযায়ী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি জাতীয় সিএসআর সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির সদস্য হিসেবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
নীতিমালায় সিএসআর ব্যয়ের জন্য রাখা হয়েছে শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতা, দারিদ্র্য হ্রাস ও জীবিকা উন্নয়ন ইত্যাদি খাতে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, প্রবীণদের সহায়তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তায় সিএসআরের অর্থ ব্যয় করা যাবে।
কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও এলাকার উন্নয়ন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ক্রীড়া উন্নয়ন এবং সড়ক ও জননিরাপত্তাও থাকবে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, জাতীয় দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে সরকার নির্ধারিত খাতেও সিএসআর অর্থ ব্যয় করা যাবে। তবে ব্যয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় উন্নয়ন, স্থানীয় প্রয়োজন, সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব, দীর্ঘমেয়াদি সুফল ইত্যাদি বিবেচনায় নিতে হবে। উন্নত ও ফলপ্রসূ সিএসআর কার্যক্রম উৎসাহিত করতে সরকার প্রতিবছর জাতীয় সিএসআর পুরস্কার দেবে।
খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, সিএসআরের টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ব্যবসায়ের খরচ ও অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয় করা যাবে না। বিজ্ঞাপন বা প্রচারের খরচ এবং রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক কাজে অনুদানও সিএসআরের ব্যয় হবে না।
ব্যয় করার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন, শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসহ উপযুক্ত সংস্থাকে অংশীদার হিসেবে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে নীতিমালায়। এ ছাড়া সিএসআর প্রকল্পের উপকারভোগী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য অংশীজনের অভিযোগ ও মতামত জানানোর ব্যবস্থা থাকবে।
খসড়ায় বলা হয়, সিএসআর কার্যক্রমের চূড়ান্ত দায়িত্ব থাকবে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের ওপর। এ জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিএসআর কমিটি গঠন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা থাকবেন দায়িত্বে।
সিএসআর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবছর সংক্ষিপ্ত বার্ষিক সিএসআর প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। এতে আগের তিন অর্থবছরের গড় কর-পূর্ব মুনাফা, বাধ্যতামূলক সিএসআর ব্যয়ের পরিমাণ, প্রকৃত ব্যয়, অব্যয়িত অর্থ ও তার কারণ, প্রধান প্রকল্প ও খাত, উপকারভোগীর পরিধি এবং অর্জিত প্রধান ফলাফল উল্লেখ করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকলে সেখানে প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্তসার প্রকাশ করতে হবে। প্রয়োজনে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছেও এ তথ্য দাখিল করতে হতে পারে। বলা হয়েছে, শুধু কত টাকা খরচ করা হয়েছে, তা দিয়ে সিএসআর কার্যক্রমের সাফল্য বিচার করা হবে না। নীতিমালায় প্রকল্পের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাবও মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক এবং বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, উদ্যোগটি খারাপ নয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে ব্যবসায়ীদের জন্য যাতে নতুন কোনো জটিলতা তৈরি না হয়। তবে কোনোভাবেই সিএসআরের ব্যয় কর-পূর্ব মুনাফার ওপর হতে পারে না।