বাংলাদেশ

চমেক হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেকই সড়ক দুর্ঘটনার

March 28, 2026
3 weeks ago
By SAJ
চমেক হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেকই সড়ক দুর্ঘটনার

সড়ক পার হওয়ার সময় গত মঙ্গলবার দুর্ঘটনার শিকার হন মো. জসীম। নগরের গণি বেকারি মোড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় জসীমের ডান হাতের কবজিতে আঘাত লাগে। এদিন দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। বিকেলে ছাড়পত্র নিয়ে বের হওয়ার সময় কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি জানান, সড়কের এক পাশ থেকে আরেক পাশে পার হওয়ার সময় একটি অটোরিকশা তাঁকে ধাক্কা দেয়। এ সময় আহত হন তিনি।

শুধু জসীম নন, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি ওয়ার্ডে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ৩৮ জন রোগী ভর্তি হন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অর্থোপেডিক সার্জারি ওয়ার্ডে শয্যাসংখ্যা সব মিলিয়ে ৮৮ হলেও রোগী থাকে দ্বিগুণের বেশি। আর ভর্তি রোগীর প্রায় অর্ধেক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার।

চিকিৎসকেরা বলেন, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের ২৬ ও ৭৯ নম্বর ওয়ার্ডে চলতি মাসের শুরু থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত অন্তত ৪০০ নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। পবিত্র ঈদুল ফিতরের বন্ধে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তাঁদের বেশির ভাগই মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার দুর্ঘটনায় আহত।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ কাওসারুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শয্যাসংখ্যা ৮৮ হলেও এর দেড়-দুই গুণ বেশি রোগী সামলাতে হয়। বিভাগের সব জেলার মানুষ এখানে আসেন। দুর্ঘটনার পাশাপাশি ট্রমা রোগীরাও আসেন এখানে। আমাদের আলাদা একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রয়োজন।’

২১ মার্চ দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপিত হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে ১৭ মার্চ পবিত্র শবে কদরের ছুটিসহ টানা সাত দিন অফিস-আদালত বন্ধ ছিল। এই সাত দিনে চট্টগ্রাম জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় দুজন, পটিয়ায় দুজন এবং মিরসরাই, লোহাগাড়া ও আনোয়ারায় তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। অধিকাংশই মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার দুর্ঘটনা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এই সাত দিনে হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ৩৬০ জন। যাদের মধ্যে ১৪৯ জন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। অর্থাৎ নতুন রোগীদের প্রায় ৪১ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আঘাত গুরুতর না হলে অনেকেই ক্যাজুয়ালটি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছাড়ছেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪ জন নিহত ও ৯৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঈদের ছুটির সাত দিন (১৭ থেকে ২৩ মার্চ) ঘটেছে ১৬টি দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৬০ জন। অর্থাৎ মোট নিহতের ৫৯ শতাংশ এবং আহতের ৬৩ শতাংশই ঘটেছে ঈদের ছুটির এই সাত দিনে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের ছুটিতে দূরপাল্লার যাত্রা, ভ্রমণ ও গ্রামমুখী মানুষের ঢল একসঙ্গে হওয়ায় সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি; অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্যের অভাব ও নিয়ম না মানার প্রবণতা। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতি, হেলমেট ব্যবহার না করা, উল্টো পথে চলাচল ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

ঈদের বন্ধ ছাড়াও চট্টগ্রাম জেলায় মার্চ মাসে প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। কেউ আহত বা নিহত হননি—এমন দুর্ঘটনা থাকলেও সেগুলোর হিসাব বিআরটিএ কিংবা পুলিশের কাছে নেই। পুলিশ বলছে, সাধারণত গুরুতর হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলে অনেকেই থানায় অভিযোগ করেন না। অনেক ঘটনা মীমাংসা হয়ে যায়। এ কারণে দুর্ঘটনার একটি অংশ হিসাবের বাইরে থেকে যায়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় প্রাইভেট কারের ধাক্কায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হন। লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের নোয়াপাড়া এলাকায় সড়ক পারাপারের সময় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় গত মঙ্গলবার গুরুতর আহত হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী।

গত বৃহস্পতিবার হাটহাজারীতে বেপরোয়া গতির ট্রাকের চাপায় এক বাইক আরোহী নিহত হন। এদিন ভোর সোয়া ৪টার দিকে উপজেলার বানিয়ারছড়া এলাকার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। একই দিন চন্দনাইশে কক্সবাজারমুখী একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধানখেতে পড়ে বাসের চালকের সহকারীসহ দুজন আহত হন।

চট্টগ্রামে ঈদ ও ঈদ–পরবর্তী অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের আশপাশে। জানতে চাইলে পটিয়া ক্রসিং হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, বেপরোয়া গতি, অসচেতনতা, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, সড়কের ত্রুটি ও সার্ভিস লেনের অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি পথচারীদের অনিয়মিত পারাপার ও পদচারী–সেতু ব্যবহার না করায়ও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।