দেখিই–না একটু কষ্ট করে...
August 24, 2026
1 month ago
By SAJ
প্রথম আলো: লম্বা বিরতি শেষে নাটকে ফিরলেন...শার্লিন ফারজানা : অভিনয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই নাটক করা শুরু করেছিলাম। শুরুর সেই সময়ে আমার যাঁরা সহশিল্পী ছিলেন, বিশেষ করে (জিয়াউল ফারুক) অপূর্ব ভাই, তাঁরা আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন। আমি এখনো অপূর্ব ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করতে সবচেয়ে বেশি কমফোর্ট ফিল করি। তাঁর সঙ্গে একটা কাজ হবে শুনলে রাজি হয়ে যাই। যেমন ‘গোলাম মামুন’ করার সময় চিন্তাই করিনি স্ক্রিপ্টটা কেমন বা আমি কী কাজ করছি। এটা আমার একটা বৈশিষ্ট্য বলতে পারেন যে সহশিল্পী যদি পছন্দের বা কমফোর্টেবল কেউ হন, বিশেষ করে অপূর্ব ভাই, তাহলে বেশি চিন্তাভাবনা করি না। তাই যখন কাজের অফারটি এল, না করতে পারিনি।প্রথম আলো : অপূর্বর সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে আপনার কমফোর্টের জায়গাটা কী?শার্লিন ফারজানা : প্রথমত অপূর্ব ভাইয়ের কাজের তো একটা নিজস্ব মান আছে। দ্বিতীয়ত, অপূর্ব ভাই অত্যন্ত কো-অপারেটিভ (সহযোগিতাপরায়ণ)। তিনি একদম ধরে ধরে পরামর্শ দেন। যেমন—‘শার্লিন মেকআপটা এভাবে করো’, ‘লুকটা এ রকম দাও।’ অনেক সময় হয়তো আমার একটি ক্লোজ শট নেওয়া হলো না বা ডিরেক্টর খেয়াল করলেন না, তখন উনি নিজে বলে দেন ‘ওর ক্লোজ শটটা নাও।’ উনি শুধু আমার সঙ্গেই না, প্রত্যেক কো-আর্টিস্টের সঙ্গেই এই কমফোর্ট জোনটা তৈরি করে দেন। আমার ধারণা, এ কারণে যেকোনো মানুষ খুব নির্বিঘ্নে তাঁর সঙ্গে কাজের জন্য হ্যাঁ বলে দেবে।শার্লিন ফারজানা। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকেপ্রথম আলো: নাটকের বাজেট ও নির্মাণে পরিবর্তন এসেছে, ফেরার পর পরিবর্তনটা কেমন লাগছে?শার্লিন ফারজানা : আমার তো এই পরিবর্তন ভালো লাগছে। আগে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে এমনও দিন পার করেছি যখন এক দিনে দুটি নাটকের শুটিং করেছি—দিনে একটা, রাতে আরেকটা। এখন সেই চাপটা নেই, কাজের কমফোর্ট (স্বাচ্ছন্দ্য) অনেক বেড়েছে। স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ার কারণে চরিত্রায়ণে আমরা অনেক বেশি সময় পাচ্ছি। ফলে কাজের মান তো ডেফিনেটলি অনেক ভালো হচ্ছে। সার্বিকভাবে আমাদের নাটকের জায়গাটার অনেক বড় উন্নতি হয়েছে। এটা নিয়ে আমি অনেক আশাবাদী।প্রথম আলো : আপনার সময়ের অনেক সহশিল্পী যখন ওটিটি বা সিনেমায় ঝুঁকছেন, তখন আপনি আবার নাটকে ফিরলেন কেন?শার্লিন ফারজানা : সত্যি বলতে, নাটককে খুব মিস করছিলাম। নাটক দিয়েই আমার ক্যারিয়ার শুরু। আমার কাছে মনে হয়, নাটকের একটা আলাদা উন্মাদনা ও সৌন্দর্য আছে। সিনেমায় হয়তো এক মাস ধরে কাজ হয়, কিন্তু নাটকে যতই সাত দিন ধরে কাজ হোক না কেন, গল্পটা কিন্তু ৪০ থেকে ৬০ মিনিটের হয়। তো এর একটা বড় চাপ থাকে, আর ওই চাপের ভেতর থেকেই পুরো টিমের সঙ্গে একটা অসাধারণ কেমিস্ট্রি তৈরি হয়। আমি এই জিনিসটা খুব মিস করছিলাম। আমার মনে হয়, পুরো এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর নাটক আমাদের দেশেই তৈরি হয়। পাকিস্তানি বা ভারতীয় সিরিজগুলোর চেয়েও আমাদের নাটকের একটা আলাদা সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা আছে, যা অনেক সময় সিনেমাতেও পুরোপুরি ফুটে ওঠে না। আমি সেই সুন্দর চরিত্রগুলো আবার করতে চেয়েছি, তাই নাটকে ফিরে আসা। তবে নাটকে সময় দিতে হলে সারা মাস সময় দিতে হয়, যা আমার পক্ষে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতি মাসে দুই-তিনটা ভালো কাজ তো আমি করতেই পারি। অনেক দিন পর নাটক করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, আগে যেভাবে দৌড়ঝাঁপ করে কাজ করতাম, আরামে সিনেমা করতে গিয়ে হয়তো সেই কাজের গতি কিছুটা কমেছে। তাই এটাকে একধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি, যাতে আবার কাজের ফ্লেক্সিবিলিটি ফিরে পাই।শার্লিন ফারজানা। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকেপ্রথম আলো: সামনে আর কী কাজ করছেন?শার্লিন ফারজানা : মাশাল্লাহ, অনেক কাজের অফার পেয়েছি। এরই মধ্যে কয়েকটি কাজ চূড়ান্ত করেছি। যেহেতু এখন সময় আছে, কাজগুলো করে ফেলব এবং এগুলো সম্ভবত আগামী ঈদেই যাবে। নভেম্বর মাসের দিকে সবাই ঈদের কাজের শুটিং শুরু করবে। তখন যদি দেশে থাকি তবে অবশ্যই শুটিং করব, আর তার আগেই এখন কয়েকটি কাজ সেরে ফেলব।প্রথম আলো : দীর্ঘ বিরতির পর কাজে ফিরলেন, অসুবিধা হয়নি?শার্লিন ফারজানা : আমি তো মাঝখানে দুটি সিনেমায় কাজ করেছি। তবে সিনেমায় সুবিধা হলো, কাজের পর অনেক কালার কারেকশন বা পোস্ট-প্রোডাকশনের সুযোগ থাকে। কিন্তু নাটকের ক্ষেত্রে তো সেই সুযোগগুলো ওভাবে থাকে না, নাটকে সরাসরি স্ক্রিনেই সবদিক থেকে ফিট থাকতে হয়। তাই মনে মনে একটা কনফিউশন বা দ্বিধা কাজ করছিল—আমি আগের মতো পুরোপুরি ফিট আছি কি না, ক্যামেরায় কেমন লাগবে। কিন্তু অপূর্ব ভাই আমাকে দারুণভাবে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমার অ্যাক্টিং যদি ভালো থাকে, তবে এগুলো নিয়ে একদম ভাববে না, আগের মতোই আছো।’ শুটিংয়ের প্রথম দিন আমার মনে হচ্ছিল আমি হয়তো আগের মতো নেই, একটু তো পরিবর্তন হয়েছেই। তবে ক্যামেরায় শট নেওয়ার পর যখন নিজে দেখলাম, মনে হলো না, খারাপ লাগছে না আসলে।শার্লিন ফারজানা। ইনস্টাগ্রাম থেকেপ্রথম আলো: কীভাবে প্রস্তুতি নেন?শার্লিন ফারজানা : চরিত্রায়ণের ক্ষেত্রে আমি মনে করি, ছোটবেলা থেকে যারা প্রচুর বই পড়ে বড় হয়েছে, তাদের অবচেতন মনেই মানুষের মনস্তাত্ত্বিক রূপ নিয়ে একধরনের অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়ে যায়। এটি চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে খুব সাহায্য করে। আর সচেতনভাবে আমরা যা করি—চরিত্রের কাছাকাছি বাস্তব জীবনের কোনো মানুষকে খুঁজি, অথবা কোনো সিনেমা বা ভিজ্যুয়াল ডায়েরি থেকে আইডিয়া ধার করি। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ভালো স্ক্রিপ্ট ও টিমওয়ার্ক। স্ক্রিপ্ট ভালো হলে চরিত্রে অভিনয়ের জন্য খুব বেশি বেগ পেতে হয় না, পাশাপাশি ডিরেক্টর ও কো-আর্টিস্টরা তো দারুণভাবে সাহায্য করেই।প্রথম আলো : এখনো কি আগের মতো বই পড়েন?শার্লিন ফারজানা : আমার বাবা সাহিত্যের মানুষ, তাই বই বা সাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ কখনোই বিচ্ছিন্ন হয়নি। এখনো নিয়মিত বই পড়ি, তবে পড়ার ধরনটা হয়তো কিছুটা বদলেছে। এখন সেলফ-হেল্প বা মার্কেটিংয়ের ওপর লেখা বই (যেমন সেথ গডিনের ‘পার্পল কাউ’) বেশি পড়ছি, কারণ ভবিষ্যতে আমার একটা করপোরেট জবে জয়েন করার ইচ্ছা আছে।শার্লিন ফারজানা। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকেপ্রথম আলো: হঠাৎ এই ইচ্ছা কেন?শার্লিন ফারজানা : আমার হাজবেন্ডকে দেখেই মূলত ইচ্ছাটা জেগেছে। প্রায়ই ও আমাকে মজা করে বলে, ‘তোমাদের তো খুব আরামের জীবন, ফ্রিল্যান্সিংয়ে একটা কাজ করো আর অনেকগুলো টাকা পেয়ে যাও! প্রতিদিন অফিসে কাজ করার যে কী কষ্ট, তা তোমরা বুঝবে না।’ ওর এই কথা শুনেই মনে হয়েছে, দেখি না একটু কষ্ট করে! একধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়েই এই করপোরেট লাইফের পরিকল্পনা করছি। জানি না কতদিন ধরে রাখতে পারব, তবে অভিনয়ের পাশাপাশি অন্য একটা পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই। আসলে আমি কাজ ছাড়া একদমই ঘরে বসে থাকতে পারি না। করোনার সময়ে যখন সবাই ঘরে বসা ছিল, আমি তখন ফুড বিজনেস করেছি এবং আলহামদুলিল্লাহ সেটি সফলও হয়েছিল। আমি একদম চুপ করে বসে থাকার মানুষ নই। ভবিষ্যতে হয়তো অনেক বয়সে বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করব, পাশাপাশি আমার একটা রেগুলার জব বা কাজ থাকবে—এটাই আমার পরিকল্পনা।আরও পড়ুনমা হয়েছেন নায়িকা শার্লিন০৫ নভেম্বর ২০২০প্রথম আলো : একজন মা হিসেবে সন্তানের জন্য কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?শার্লিন ফারজানা : আমার চাওয়া খুব সাধারণ। আমাদের যে পাঁচটি মৌলিক অধিকার আছে, কোনো সরকার যদি সেই পাঁচটি মৌলিক অধিকারকে সাধারণ মানুষের কাছে একদম সহজলভ্য করে দিতে পারে, তবে এর চেয়ে বেশি কিছু আমি চাই না। অনেক মেট্রোরেল বা জাঁকজমকপূর্ণ অবকাঠামোর চেয়েও আমাদের কাছে বেশি জরুরি শিক্ষার হার বাড়ানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার বাজেট নিয়ন্ত্রণে রাখা, লোডশেডিং আর ট্রাফিক জ্যাম কমানো। একই সঙ্গে আমাদের দেশ থেকে যদি দুর্নীতিটা একটু কমে, তবে আমরা অন্তত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারব। দৈনন্দিন জীবনে যদি এই মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে একটু স্বস্তি ফিরে আসে, তবে আমি বিশ্বাস করি আমাদের সন্তানরা এ দেশেই একটা সুন্দর ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পাবে।প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুনআলাপন থেকে আরও পড়ুনসাক্ষাৎকারবাংলা নাটকঅভিনয় শিল্পী