জীবনযাপন

ঈদে ১০টি গরু কাটার কাজ নেবেন আমজাদ, কত টাকায় কাটবেন একেকটি?

May 23, 2026
1 week ago
By SAJ
ঈদে ১০টি গরু কাটার কাজ নেবেন আমজাদ, কত টাকায় কাটবেন একেকটি?

ভরদুপুরে কারওয়ান বাজারে গিয়েও দেখা গেল বেজায় ব্যস্ত মো. আমজাদ। দোকানের সামনে ক্রেতাদের ভিড়, তাঁদের ফরমাশমতো মাংস কাটছেন, ওজন দিচ্ছেন, দাম নিচ্ছেন। কথা বলার ফুরসতই নেই। পরিচয় দিতেই তাকিয়ে বললেন, ‘বিকেলে আসেন, কথা বলা যাবে।’

বেচাকেনার গতি দেখে মনে হয়েছিল, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সব মাংস শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেলে যখন আবার গেলাম, তখনো লোহার আংটায় ঝুলছে কয়েক ফালি গরুর মাংস। হাতে দা নিয়ে বসে ছিলেন ৪২ বছর বয়সী আমজাদ। জানতে চাইলাম, ‘এখনো বিক্রি শেষ হয়নি?’

বললেন, ‘বিক্রি একটু ডাউন।’

আমজাদ কারওয়ান বাজারের পরিচিত কসাই। নিজের নামেই দোকানের নাম ‘আমজাদ এন্টারপ্রাইজ’। প্রতিদিন একটি গরু জবাই করেন। সাধারণত বিকেল হওয়ার আগেই সব মাংস বিক্রি হয়ে যায়। দোকানের ভেতরে তখন দুজন হ্যাংলা–পাতলা তরুণ একটি ডিপ ফ্রিজ ঠেলে এক পাশ থেকে আরেক পাশে সরাচ্ছিলেন। অবিক্রীত মাংস হয়তো সেখানে তুলে রাখা হবে।

সামনে কোরবানির ঈদ, নিশ্চয়ই ব্যস্ততা বাড়বে, সেই নিয়েই কথা শুরু করি। আমজাদ জানালেন, গত বছর কেটেছিলেন ১৪টি গরু। এবার? ‘১০টার বেশি কাটব না। শরীরও তো একটা জিনিস,’ হালকা হেসে বলেন আমজাদ।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে খুব ছোট বয়সেই ঢাকায় এসেছিলেন আমজাদ। বয়স তখন সাত কি আট। তাঁর চাচা মো. করিম ছিলেন কারওয়ান বাজারের পরিচিত কসাই। চাচার হাত ধরেই রাজধানীর ব্যস্ত এই বাজারে তাঁর পথচলা।

শুরুতে অবশ্য হাতে ছুরি ওঠেনি। চাচার ফাইফরমাশ খাটতেন—চা এনে দেওয়া, বাসা থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে আসা, বাজারের ব্যাগ বাসায় পৌঁছে দেওয়া। তারপর ধীরে ধীরে কসাইখানার কাজ শেখা। কীভাবে পশুর পা বাঁধতে হয়, আলগোছে কীভাবে পশুটাকে শোয়ানো যায়, জবাইয়ের পর কীভাবে চামড়া আলাদা করতে হয়, কোথায় চাপ দিলে মাংস নষ্ট হয় না—সব হাতে–কলমে শিখেছেন।

সেই ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত কারওয়ান বাজারেই আছেন। এখন তাঁর নিজের দোকান। সেখানে কাজ করেন ছয়জন।

গ্রামের বাড়িতে থাকেন স্ত্রী আর দুই ছেলে। বসুন্ধরা শপিং মলের পেছনের তেজতুরীবাজারের একটি মেসে থাকেন আমজাদ। প্রতি সপ্তাহেই বাড়ি যান। কিন্তু কোরবানির ঈদে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ, শুধু শক্তি থাকলেই হয় না; মাংস প্রস্তুতের জন্য দরকার অভিজ্ঞতা। আর এ জন্য চাই দক্ষ কসাই। আমজাদ বলেন, ‘আমি যেভাবে সুন্দরভাবে কাটতে পারব, সবাই তো তা পারবে না। ভুলভাবে কাটলে চামড়া নষ্ট, গোশতও নষ্ট। এত দামের গরু কিনে কেউ তো সেটা নষ্ট করতে চাইবে না।’

কোরবানির ঈদে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাঁধা খদ্দেরদের বাড়িতে গিয়ে গরু জবাই থেকে শুরু করে মাংস প্রস্তুতের কাজ করেন আমজাদ ও তাঁর দল। ঈদের দিনের সূচি তাঁর মুখস্থ। ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, ফজরের নামাজ আদায় করে হাঁটা দেন দিলু রোডের দিকে। এই এলাকায় দীর্ঘদিন কিছু বাসায় গরু কাটার কাজ করেন। তাই সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে দিলু রোড মসজিদে ঈদের জামাতে অংশ নেন। নামাজ আদায় করে শুরু হয় একের পর এক কোরবানির পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো, মাংস বানানো।

‘কেউ সকাল সকাল ডাকেন, কেউ আটটা-নয়টায়, আবার কেউ দুপুর বা বিকেল পর্যন্ত সময় দেন। অনেকে তো পাঁচটার পরও কোরবানি করেন,’ বলছিলেন তিনি।

বছরের এই একটি দিনেই বাড়তি কিছু আয় হয়। ‘তা ছাড়া ঈদের পর ১৫ দিনের মতো দোকানে বেচাকেনা থাকে না। এই আয় দিয়াই চলতে হয়,’ বলেন আমজাদ।

কোরবানির মৌসুমে কসাইদের পারিশ্রমিক নির্ধারণেরও আলাদা হিসাব আছে। সাধারণত গরুর দাম অনুযায়ী মাংস কাটার রেট ধরা হয়। সকালের দিকে আমজাদেরা ‘হাজারে ২০০ টাকা’ হিসাবে কাজ নেন। অর্থাৎ এক লাখ টাকার গরু হলে মাংস তৈরি করে দিতে নেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা। তবে সময় যত গড়ায়, দরও পড়তে থাকে। বিকেলের দিকে কখনো কখনো হাজারে ১০০ টাকাতেও কাজ করে দেন।

‘সকালে সবাই তাড়াহুড়া করে। তখন ভালো কসাইয়ের চাহিদাও বেশি থাকে,’ বলেন তিনি।

আমজাদের সঙ্গে এবার ছয়জনের দল কাজ করবে। তিনজন পেশাদার আর তিনজন অনভিজ্ঞ বা সহকারী। পেশাদারদের কাজ গরু জবাইয়ের জন্য প্রস্তুত করা, চামড়া ছাড়ানো, মাংসের মূল অংশ কেটে আলাদা করা; আর সহকারীরা মাংস টুকরা, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার কাজে সাহায্য করেন।

সারা জীবন ছুরি হাতে কাটালেও নিজের সন্তানদের এই পেশায় দেখতে চান না আমজাদ। তাঁর দুই সন্তান পড়াশোনা করছে। বড় ছেলে আগামী বছর এসএসসি দেবে। তিনি চান তারা অন্য কিছু করুক। একবার কোরবানির ঈদে বড় ছেলেকে সঙ্গে এনেছিলেন। ‘ও আমার লগে সারা দিন ছিল। বাসায় আইসা কইছে, আর আসব না। অনেক কষ্টের কাজ,’ হেসে বলেন আমজাদ।

ঈদের পরদিন বাড়ি ফিরে যান তিনি। সেদিন নিজের কোরবানির পশু জবাই করেন। অন্যের ঈদ শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় তাঁর নিজের ঈদ।