এক বছরে ধর্ষণ বেড়েছে ২৭%
মানুষের কষ্ট-দুর্ভোগ বুঝতে চাইলে আদালত আর হাসপাতালে আসুন—কথাটা মুখে মুখে বেশ চালু। তবে এটা চরম সত্যও। ১ মার্চ ঢাকার চারটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ঘোরার সময় অচেনা মুখগুলোতে বিষাদ ও উৎকণ্ঠার ছাপগুলো খুব স্পষ্টই অনুভব করা যাচ্ছিল।
কক্ষের ভেতরে স্থান সংকুলান হয় না, তাই বাইরে বারান্দায় পেতে রাখা বেঞ্চে বসে ছিলেন ভুক্তভোগী নারী ও তাঁদের স্বজনেরা। মামলার নম্বর আর নাম ধরে ডাক পড়তেই নারীরা উৎকণ্ঠা নিয়ে বিচারকের সামনে দাঁড়াচ্ছিলেন। একটি ট্রাইব্যুনালে মাইক্রোফোন ব্যবহারের কারণে ভুক্তভোগী নারীদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা শোনা যাচ্ছিল স্পষ্ট।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪–এ পেছনের বেঞ্চে এই প্রতিবেদকের পাশে বসে ডাক পাওয়ার আশায় ছিলেন এক তরুণী। এই ট্রাইব্যুনালে মাইক্রোফোন নেই, ফলে বাদীদের বিষাদ আর অবসাদগ্রস্ত কণ্ঠ বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছিল না। শোনা যাচ্ছিল শুধু বিচারক ও আইনজীবীর কথা।
বোঝা যাচ্ছিল, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এক শিশুর মামলায় এক আসামির জামিনের আবেদন করা হয়েছিল, বিচারক তা নাকচ করে দিয়েছেন। শিশু ধর্ষণ মামলার আসামির দিকে তাকিয়ে বিচারক ভর্ৎসনা করলেন। সেদিকে তাকিয়ে ওই তরুণী পাশে বসে থাকা এই প্রতিবেদককে বললেন, তিনি প্রেমিকের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক ধর্ষণের মামলার আবেদন নিয়ে এসেছেন। মানসিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। কথা বলার এক পর্যায়ে মুখ ঢেকে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন তিনি।
ঢাকার এই আদালতগুলোতে যখন ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে আবেদন নেওয়া ও শুনানি হচ্ছে, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরপর কয়েকটি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার ঘটনা উঠে এসেছে আলোচনায়।
পাবনায় দাদিকে হত্যা করে কিশোরী নাতনিকে ফসলের খেতে টেনে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। নরসিংদীতে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের শিকার একটি মেয়ের পরিবার বিচার চেয়েছিল স্থানীয়ভাবে। মেয়েটি পরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। সীতাকুণ্ডে সাত বছরের শিশুকে যৌন সহিংসতার পর গলা কেটে দেওয়া হয়। রক্তাক্ত শিশুটি জঙ্গল থেকে একা হেঁটে বের হয়েছিল, যা দেখে অনেকে শিউরে ওঠেন। দেড় দিন লড়াইয়ের পর হাসপাতালে মৃত্যু হয় শিশুটির। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী সাবেক প্রেমিকের ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মব সহিংসতার ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও ঘটে গেছে নারী নিপীড়নের ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই তরুণীকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন আরেক শিক্ষার্থী। এরপর আরও ঘটনা ঘটেছে। ৩ মার্চ সাহরি খেতে ওঠার সময় কক্সবাজারের উখিয়ায় বাড়িতে ঢুকে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। ঘটনাস্থলেই গৃহবধূর মৃত্যু হয়।
এসব ঘটনার কোনোটিতে মামলা হয়েছে, কোনোটিতে হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত এক বছরে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। গত বছর নারী নির্যাতনের যত মামলা হয়েছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধর্ষণের অভিযোগের।
এ পরিস্থিতির মধ্যে প্রত্যাশার স্লোগান নিয়ে আজ ৮ মার্চ রোববার দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’।
নারী প্রতি সহিংসতা বন্ধ সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয় বলে মনে করেন নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে তাঁর কার্যালয়ে প্রথম আলোকে বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিদ্বেষমূলক আচরণ বন্ধ করা শুধু সরকারের একার কাজ নয়, এটা সবার দায়িত্ব। এটা মোকাবিলায় সম্মিলিত সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। নারীর মর্যাদা রক্ষার জন্য সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন। নারীকে মর্যাদার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ৯টি অভিযোগে মামলা করা যায়। সেগুলো হলো ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যু, বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, যৌন পীড়ন, যৌতুক, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, দহনকারী পদার্থ দিয়ে সংঘটিত অপরাধ।
২০২৫ সালে হওয়া মামলার মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের অভিযোগের। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫ হাজার ১৭১ জন ও শিশু ১ হাজার ৮৯৭টি। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। তার আগে ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি ও ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি মামলা হয়েছিল নারী নির্যাতনের অভিযোগে।
উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি। ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১ হাজার ৫৬৭টি। ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ৩ হাজার ৯১টি মামলা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারীর ওপর সহিংসতা, সহিংসতার হুমকি, নিপীড়ন, হেনস্তা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর ওপর খবরদারি করতে পারার প্রবণতার একটা পর্যায় হচ্ছে নারীর ওপর সহিংসতা। পুরুষের আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে নারীর ওপর সহিংসতা করার তার অধিকার আছে এবং সে পার পেয়ে যাবে।’
নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বড় রকমের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে শিরীন পারভীন বলেন, এ আন্দোলনের মূল বার্তা হবে—নারীকে মানুষ হিসেবে চিনুন, জানুন, সম্মান করুন। নারীর ওপর সহিংসতা জাতীয় সমস্যা হিসেবে মনে করতে হবে সরকারকে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
গত বছরের মার্চে মাগুরার আট বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ষণের মামলার বিচারে উল্লেখযোগ্য কিছু সংশোধন এনে ওই বছরের ২৫ মার্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। আইনে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণকে ধর্ষণের ধারায় (৯)–এ রাখা হলেও ভিন্ন উপধারায় (৯খ) ভিন্ন শিরোনামে (বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম করিবার দণ্ড) নেওয়া হয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড নির্ধারণ হয়েছে।
এ ছাড়া ভুক্তভোগী ও আসামির ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে বলা হয়, আদালত যদি মনে করে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মেডিক্যাল সনদ দিয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করা যাবে, তাহলে ডিএনএ পরীক্ষা লাগবে না। ধর্ষণের (৯খ বাদে) ঘটনার তদন্ত ও বিচারের সময় অর্ধেক করা হয়েছে। তদন্ত হবে ১৫ দিনে এবং বিচার হবে ৯০ দিনে। তবে বিচারক মনে করলে সময় বাড়াতে পারবেন।
আইন অনুসারে, ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড।
এর মধ্য দিয়ে ২০০০ সালে প্রণীত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গত পাঁচ বছরে দ্বিতীয়বার সংশোধন আনা হয়। এর আগে ২০২০ সালে সিলেট ও নোয়াখালীতে দলবদ্ধ ধর্ষণের দুটি ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই আইনের অধীন ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করেছিল। পাশাপাশি ধর্ষণের মামলার আসামি শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে।
এক প্রশ্নের জবাবে শিরীন পারভীন হক বলেন, ‘নারীর ওপর সহিংসতা চলমান থাকার ঘটনায় নারী আন্দোলনের ব্যর্থতাও আছে। আমরা অনেক কিছু ধরে রাখতে পারি না। ২০২০ সালে বেগমগঞ্জে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের ঘটনায় বিভিন্ন প্রজন্মের নারীরা এক হয়ে বড় বিক্ষোভ করতে পেরেছিলেন। সেই প্রতিবাদ ধরে রাখতে পারলে হয়তো কিছু পরিবর্তন দেখতে পেতাম। তবে নারী আন্দোলনের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।’
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলেই মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যখন কোনো ঘটনা ঘটে, তখন সেটা নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু যিনি ঘটনার শিকার হয়েছেন, তাঁর পাশে থাকা বা মামলার বিচার ও তদন্ত ঠিকঠাকভাবে হচ্ছে কি না, তা অনুসরণ করা হয় না। আবার অনেক ঘটনায় ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ভুক্তভোগী নারীকে দোষারোপ করা হয়।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ১১ হাজারের বেশি মামলা তদন্ত করে ধর্ষণের ৪৪ শতাংশ অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানায়। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আট বছরে ধর্ষণের অভিযোগে থানা ও আদালতে এসব মামলা করা হয়েছিল। পিবিআই এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রমাণিত না হওয়া মামলার অন্তত ৩০ শতাংশ সত্য। সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে, বাদীর অনীহা আর তদন্ত কর্মকর্তার অদক্ষতায় তদন্তে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
শুধু বিচারপ্রক্রিয়া তদারকি না করে তদন্তপ্রক্রিয়ার দিকেও নজর দেওয়া দরকার বলে মনে করেন আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ করা হচ্ছে কি না, দেখতে হবে। মামলায় পুলিশ ও চিকিৎসকের মতো পেশাদার সাক্ষীরা অনেক সময় আসেন না। অনেকে বদলি হয়ে যান। তাঁদের আসা-যাওয়ার কোনো খরচও দেওয়া হয় না। এ বিষয়টা সমন্বয় করা দরকার। সাক্ষী সুরক্ষা জরুরি।
নারী নির্যাতনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন সারা হোসেন। তাঁর মতে, মামলার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর আর্থিক, আইনি ও স্বাস্থ্যগত সহায়তা দরকার। ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও সেলগুলোকে নিজস্ব অর্থায়নে ব্যাপকভাবে পরিচালনার জন্য বড় কর্মসূচি নেওয়া দরকার।