অর্থনীতি

পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়ছে, কোথাও ভাড়া বেড়েছে, কোথাও চলছে দর–কষাকষি

April 20, 2026
1 hour ago
By SAJ
পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়ছে, কোথাও ভাড়া বেড়েছে, কোথাও চলছে দর–কষাকষি

অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়ানোর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পরিবহন খাতে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজধানীমুখী পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাকভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও ট্রাকভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও ভাড়া বাড়াতে দর-কষাকষি চলছে।

এর ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে এবং জীবনযাত্রার খরচ আরেক দফা বাড়বে।

প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম গতকাল রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে।

গতকাল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ ১২ কেজিতে দাম বাড়ল ২১২ টাকা। চলতি মাসে এ নিয়ে দুবার দাম বাড়ানো হলো।

মূলত মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরোক্ষ শর্তে দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়ানো হয়।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে গতকাল রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে নিজ দপ্তরে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে, না-ও বাড়তে পারে। জ্বালানি তেলের দাম যতটুকু বেড়েছে, সেটি বেশি নয়, মূল্যস্ফীতির ঝুড়িতে জ্বালানি তেলের অংশ সামান্য।’

দেশের অন্যতম প্রধান পণ্য পরিবহন রুট হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট। চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ থেকে সারা দেশে পণ্য পরিবহন হয়।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানিসংকটের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পণ্য পরিবহনভাড়া ট্রাকপ্রতি এমনিতেই গড়ে ১০ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। গতকাল থেকে জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকরের ফলে পণ্য পরিবহন খরচ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন আন্তজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি অনিল চন্দ্র পাল।

অনিল চন্দ্র গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাকভাড়া ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা ছিল। কিছুদিন ধরে সংকট চলায় এই ভাড়া ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের জানানো হয়েছে রোববার থেকে ডিজেল পাওয়া যাবে। এ খবরে ভাড়া ২০-২২ হাজার টাকার আশপাশে নেমেছে। তবে তেল পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে বলা যাবে পরিবহন খরচ কত হবে।’

কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম থেকে সারা দেশে চাল আসে। এত দিন খাজানগর মোকাম থেকে ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জে ট্রাকভাড়া ছিল ১৮-২০ হাজার টাকা। গত শনিবার পর্যন্ত এই ভাড়ায় রাজধানীতে চালের ট্রাক এসেছে। গতকাল থেকে ট্রাকপ্রতি ভাড়া দেড় হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে।

কুষ্টিয়া চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রথম আলোকে বলেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ট্রাকভাড়া বেড়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম বাড়বে।

বগুড়ার মহাস্থান হাট হলো দেশের অন্যতম বড় সবজির পাইকারি হাট। সেখান থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে সবজির চালান যায়। বগুড়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত ৫ টনের একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৬-১৮ হাজার টাকা। গতকাল ট্রাকভাড়া ২-৩ হাজার টাকা বাড়তি চাওয়া হয়েছে। আজ সোমবার থেকে বর্ধিত ট্রাকভাড়া কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

মহাস্থান হাটের সবজির পাইকারি আড়তদার মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর ট্রাকভাড়া এখনো বাড়ানো হয়নি। তবে সোমবার থেকে বর্ধিত ট্রাকভাড়া কার্যকর হবে।

বগুড়ার ট্রাকমালিক উজ্জ্বল শেখ বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। তবে বর্ধিত ভাড়া এখনো কেউ দিচ্ছেন না। বর্ধিত ভাড়া চাইলে পণ্য পরিবহনে কেউ রাজি হচ্ছেন না।

এদিকে যাত্রী পরিবহনের জন্য বাসভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত না হলেও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে যাত্রীবাহী লঞ্চভাড়া ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থা। গতকাল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রথম ধাপে পরিবহন খরচ বাড়ে। আর দ্বিতীয় ধাপে উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ে।

এবার দেখা যাক, দাম বাড়বে কীভাবে। উৎপাদনস্থল থেকে বাজার পর্যন্ত আসতে পণ্যের পরিবহন খরচ ১০ শতাংশ বাড়লেও তা মূল্যের সঙ্গে যোগ হবে। এর আগে যদি উৎপাদন খরচ বাড়ে, তা আগেই পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাজারে আসবে।

উৎপাদন খরচ কীভাবে বাড়বে, তার একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কিছুদিন পর আমনের মৌসুম। লোডশেডিং থাকলে ডিজেল ব্যবহার করে জেনারেটরের মাধ্যমে পাম্প চালাতে হবে। প্রতি লিটার ডিজেল কিনতে এখন বাড়তি ১৫ টাকা খরচ বেশি পড়বে। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। বাজারে এর প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া ওই চালের চালান যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে যাবে, তখন বাড়তি ট্রাকভাড়াও দিতে হবে।

শুধু চাল নয় শাকসবজি, আলু, পেঁয়াজসহ অন্যান্য নিত্য ভোগ্যপণ্যের দামও একই হারে বাড়তে পারে। গতকাল বিকেলে সরেজমিনে কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পটল, শসা, পেঁপেসহ কিছু শাকসবজির দাম বাড়তে শুরু করেছে। কেজিতে দাম বেড়েছে ১০-১৫ টাকা।

কারওয়ান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী মো. শওকত খান প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর কারওয়ান বাজারে এখনো সবজির চালান আসেনি। সোমবার ভোরে সবজি আসবে। ওই চালান আনতে ট্রাকভাড়া বেশি নেওয়া হলে বাজারে সবজির দাম বাড়বে। ট্রাকভাড়া বাড়লে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, রসুনসহ অন্য নিত্যপণ্যের দামও বাড়বে।

এক বছরের বেশি সময় ধরে পোশাক-আশাক, তেল-সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, খাতা-কলম ইত্যাদি খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বাড়তি। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে আরও উসকে দেবে। এদিকে এসব পণ্যের কাঁচামালসহ উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে দাম বাড়াবে প্রস্তুত পণ্যের।

এ ছাড়া পোশাক কারখানাসহ ছোট-বড় শিল্পকারখানায় ডিজেলচালিত জেনারেটর চলে। লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় জেনারেটরের ব্যবহার বাড়বে।

জিনিপত্রের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। অবশ্য তিন বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে।

২০২২ সালের আগস্ট মাসে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একলাফে রেকর্ড ৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছিল। ওই মাসে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশ হয়েছিল। এরপর মূল্যস্ফীতি আর সহনীয় পর্যায়ে নামেনি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, অবধারিতভাবে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে। কারণ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে জীবনের পদে পদে খরচ বাড়ে। যেমন পরিবহন খরচ বাড়বে, উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে শুধু সীমিত আয় ও মধ্যবিত্ত নয়, সব শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রায় আরেক দফা খরচ বাড়বে। তিনি মনে করেন, জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।