জীবনযাপন

গ্লাস মিস্ত্রির কাজ করেছেন, এখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

January 18, 2026
3 months ago
By SAJ
গ্লাস মিস্ত্রির কাজ করেছেন, এখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

পকেটে মাত্র ৫০০ টাকা। সঙ্গে একরাশ অনিশ্চয়তা। পড়াশোনাকে ‘চিরতরে বিদায়’ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে পা রেখেছিলেন গিয়াস উদ্দিন। তখন বয়স মাত্র ১৬। থাই গ্লাসের কাজ শিখবেন, কাজ করবেন—এই ছিল ভাবনায়। সেই দিন আর নেই। গিয়াস উদ্দিন এখন চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক।

১৯৯৯ সালে ফেনী সদর উপজেলার পশ্চিম ছনুয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। ওই গ্রামের স্কুল থেকেই মাধ্যমিক পাস করেন। উচ্চমাধ্যমিক চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে গিয়াস ছোট।

চট্টগ্রামে আসার সেই দিনটা আজও মনে আছে গিয়াসের। বাস থেকে নেমেই নন্দনকাননের একটি দোকানে ব্যাগ রেখে ওস্তাদের (সুপারভাইজার) সঙ্গে থাই গ্লাসের কাজে যোগ দিয়েছিলেন। প্রথম কাজ ছিল নগরের আলকরণ এলাকার একটি বাসায়। এরপর আলুর গুদামে কাজও করেছেন তিনি। এভাবেই কাজের পাশাপাশি পড়ালেখা করে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন।

পড়াশোনা কখনোই সহজ ছিল না গিয়াস উদ্দিনের জন্য। স্কুলের মেধাতালিকায় সব সময় প্রথম হওয়া গিয়াস মাধ্যমিকে পেয়েছিলেন জিপিএ-৫। ওই মাধ্যমিক পর্যন্তই তাঁর পড়াশোনার খরচ বহন করেছিলেন মেজ ভাই। এরপর বাধ্য হয়েই তাঁকে কাজে নামতে হয়।

গিয়াস তখন থাই গ্লাসের কাজ করেন। ভালো ছাত্র ছিলেন, সেই সুবাদেই আবার পড়ালেখা শুরুর ইচ্ছাটা প্রায়ই ভেতরে-ভেতরে উঁকিঝুঁকি দিত। একবার এক বাড়িতে কাজ করার সময় দেখলেন, বাড়ির মেয়েটি গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ছে। খুব কষ্ট হয়েছিল গিয়াসের। মনে মনে ভাবছিলেন, আমারও তো এখন পড়ার টেবিলেই থাকার কথা!

আরেকবার চট্টগ্রাম নগরীর নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির এক বাড়িতে কাজ করতে গিয়েছেন, পরদিন ছিল বাড়ির মালিকের ছেলের দ্বাদশ শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষা। কাজ করতে করতে সেদিন রাত ১২টা বেজে গিয়েছিল। ছেলের পড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে, সে জন্য ভীষণ বকাঝকা করেছিলেন বাড়ির কর্তা। সেদিনই মনে একরকম জেদ চেপে গিয়েছিল গিয়াসের—আবার পড়া শুরু করবেন।

এক বছর বিরতির পর চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন তিনি। মানবিক বিভাগে। সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস করতেন, বাকি সময় কাজ। ফলে অনেক সহপাঠীর কাছেই গিয়াস ছিলেন অচেনা।

চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনার সময় রিয়াজউদ্দিন বাজারের চৈতন্য গলির একটি আলুর গুদামের ওপর থাকতেন গিয়াস উদ্দিন। ছোট্ট ঘরে মাটিতে গাদাগাদি করে ঘুমাতেন পাঁচজন। বই রাখার জায়গাও ছিল না। তাই সুযোগ পেলেই ডিসি হিল পার্কে বসে পড়াশোনা করতেন। এভাবেই প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দেন।

নন্দনকানন গ্লাস মার্কেটের এক সহকর্মী গিয়াসের পড়াশোনার আগ্রহ দেখে বলেন, ‘এই জায়গা তোমার জন্য না। কাজটা ছেড়ে পড়াশোনায় মন দাও।’ ঠিক সেই সময়ই বন্ধুর ভগ্নিপতির আসবাবের দোকানে কাজ পেয়ে যান গিয়াস। থাকার ব্যবস্থাও হয় বন্ধুর সঙ্গে। সিদ্ধান্ত নিয়ে নন্দনকানন ছাড়েন তিনি।

সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দোকানে ডিউটি। এর ফাঁকে ফাঁকেই চলত পড়াশোনা। মালিকপক্ষও ক্লাস করার সুযোগ দিতেন। এভাবেই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি।

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য গ্রামে গিয়ে থেকেছিলেন তিন মাস। টিউশনি করতেন, নিজেও পড়তেন। পরে ভর্তিযুদ্ধে জায়গা করে নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। আগে কাজের সূত্রে দুইবার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এলেও ভেতরে ঢোকা হয়নি। ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি প্রথমবার গিয়াস ছাত্র হিসেবে পা রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কিস্তিতে টাকা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু থেকেই টিউশনি করতেন। প্রথম বর্ষেই টিউশনি পাওয়া খুব কঠিন ছিল। তবু টিউশনি করেই নিজের পড়াশোনা ও মা-বাবার খরচ চালিয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হলে থাকতেন। ডাইনিংয়ে এক বেলা খাবারের দাম ছিল ২০ টাকা। অনেক সময় সেই টাকাও থাকত না। বহু রাত কেটেছে না খেয়ে। টিউশনি আর পড়াশোনার সমন্বয়েই এগিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা। শেষ পর্যন্ত স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ৩ দশমিক ৫৮ সিজিপিএ নিয়ে।

নন্দনকানন গ্লাস মার্কেটে প্রথম কাজ করেন ‘ওস্তাদ’ নওশাদ ভাইয়ের সঙ্গে। পরের ওস্তাদ ছিলেন ‘রহমান ভাই’। সবার প্রতিই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন গিয়াস উদ্দিন। বন্ধুবান্ধবরাও তাঁকে সহায়তা করেছেন। আরাফাত নামে এক বন্ধুর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করলেন।

বর্তমানে চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রভাষক হিসেবে যুক্ত আছেন গিয়াস উদ্দিন। তবে নিজেকে এখনো শিক্ষার্থী ভাবতেই তাঁর ভালো লাগে। বলছিলেন, ‘লড়াই তো সবে শুরু। সামনে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।’