বাংলাদেশ

হাম মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের সুপারিশে গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার

April 25, 2026
1 hour ago
By SAJ
হাম মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের সুপারিশে গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার

হাম মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ খুব একটা আমলে নিচ্ছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ১২ এপ্রিলের যৌথ সভা থেকে বিশেষজ্ঞরা একটি বহুপক্ষীয় কমিটি গঠনসহ বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করেছিলেন। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হতে দেখা যাচ্ছে না।

২৩ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) যোগাযোগ করলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা কমিটি গঠনের যে সুপারিশ করেছেন তা আমি জানি না, আমাকে এখনো জানানো হয়নি।’

মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর দুটি বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রথম যৌথ সভা হয় ১২ এপ্রিল। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং টিকাবিষয়ক দেশের সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপের (নাইট্যাগ) চেয়ারপারসন ফিরদৌসী কাদরী। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত নাইট্যাগ স্বাধীনভাবে সরকারকে পরামর্শ দেয়। নাইট্যাগের সদস্য ১৫ জন। নাইট্যাগের সর্বশেষ কমিটি গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই।

সভায় নাইট্যাগ ছাড়া ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশনের (এনভিসি) চেয়ারপারসন ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এনভিসি দেশের হাম–রুবেলা নির্মূল পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিশনকে অবহিত করার পাশাপাশি সরকারকে পরামর্শ দেয়। এনভিসিও গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মাহমুদুর রহমানকে চেয়ারপারসন করে এনভিসির সর্বশেষ কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। কমিটির সদস্যসংখ্যা ৯ জন।

ফিরদৌসী কাদরীর সই করা ওই সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, যৌথ সভার পক্ষ থেকে একটি বহুপক্ষীয় কমিটি গঠন করার সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে বলা হয়, শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগতত্ত্ববিদ, ভাইরাস বিশেষজ্ঞ, ল্যাবরেটরি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অন্য বিশেষজ্ঞদের এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই কমিটির কাজ হবে রোগ শনাক্তের অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্দেশনা দেওয়া। এই কমিটি এখনো গঠিত হয়নি।

কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, ওই দিনের যৌথ সভায় দুই বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যরা হাম বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা বলেছিলেন। তাঁরা হামের বিস্তার রোধে কার্যকর যোগাযোগ করার কথাও বলেছিলেন। বলেছিলেন, কর্মসূচির বাস্তবায়ন যেন উচ্চ মানের হয়।

এই যৌথ সভার আগেই ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ৩০টি উচ্চ ঝুঁকির এলাকায় হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়। আর সভার দিন অর্থাৎ ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ—এই চারটি সিটি করপোরেশনে টিকা দেওয়া শুরু হয় এবং দেশব্যাপী টিকা ক্যাম্পেইনের দিন ঠিক হয়ে যায়। যৌথ সভায় বলা হয়, টিকা কার্যক্রমকে জোরালো পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখতে হবে।

ওই দিনের যৌথ সভায় যুক্ত ছিলেন এমন দুজন জনস্বাস্থ্যবিদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের গত দুই দিনে দেশের হাম পরিস্থিতি, বিশেষজ্ঞদের সভার আলোচনার বিষয়বস্তু এবং যৌথ সভার সুপারিশ নিয়ে কথা হয়। তাঁরা কেউ পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি। তাঁদের একজন বলেছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তাদের সক্রিয়তার ঘাটতি আছে। অন্যজন বলেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ না জানাটাও দুঃখজনক।

গত দুই দিনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের মতামত বা বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ইপিআইয়ের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেওয়ার মতো কেউ নেই। ইপিআইয়ের প্রধান কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকেন একজন উপপরিচালক। ৯ এপ্রিল তাঁকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়।

যোগাযোগ করলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছি, আমরা বসে নেই। আমরা অনেক কাজ নাইট্যাগের সভা হওয়ার বা সুপারিশ করার আগেই শুরু করেছি। আমরা দ্রুততম সময়ে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পেরেছি। বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে যে কমিটি গঠনের সুপারিশ নাইট্যাগ করেছে, তা গঠন করার প্রক্রিয়া চলছে। এ নিয়ে কাজ হচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞ কমিটির সভায় কিছু জটিল কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল কোন ধরনের রোগীকে আইসোলেশন করার দরকার, তা নির্দিষ্ট করা ও তা অনুসরণ করা। এ ছাড়া কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে থাকা শিশুদের হামের টিকা দেওয়া। এসব বিষয়ে এখনো কোনো পদক্ষেপের কথা জানা যায়নি।

পুরো বিষয়টির মধ্যে একধরনের অবহেলা, অনীহা আছে বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করছেন, মন্ত্রী তা জানেন না, সুপারিশ বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এখানে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। হামের এই জরুরি পরিস্থিতিতে এটা নিন্দনীয়।