বাংলাদেশ

জাহাজটির কাছে তিন দিনেও কেন যেতে পারেনি তদন্তকারী দল

August 17, 2026
2 days ago
By SAJ
জাহাজটির কাছে তিন দিনেও কেন যেতে পারেনি তদন্তকারী দল

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর তিন দিন পেরিয়ে গেছে। জাহাজটিতে দুর্ঘটনার কারণ জানতে শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও শিপব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সে তিন তদন্ত কমিটির কোনো সদস্যই এখন পর্যন্ত জাহাজের কাছে দুর্ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি। তবে আজ সোমবার বুয়েটের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল দুর্ঘটনা বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে।

বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের তীব্রতা ও বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকায় এর আগে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেননি, যার কারণে এবার বুয়েটের রসায়ন বিভাগের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে একটি বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া জাহাজটিকে গ্যাসমুক্ত করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ঘটনার দিন গত শুক্রবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সিদ্ধার্থ ভৌমিক স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশে অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে প্রদান করে ১১ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে শিল্প মন্ত্রণালয়। একই দিন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হককে প্রদান করে ৯ সদস্যের আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। সেদিনই বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

আগের গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো দুর্ঘটনাস্থলে যেতে না পারায় গতকাল রোববার সন্ধ্যায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. আরিফুল ইসলাম প্রিন্স স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশে ৮ সদস্যের বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞ দলটি গঠন করা হয়। বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান করা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খানকে। আট সদস্যের কমিটিতে রয়েছেন বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ক্যাপ্টেন মো. শোয়েব আহমদ ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার।

বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের জন্য এর আগে সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসন শিল্প মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল বলে জানা গেছে। গতকাল বিকেলে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বিশেষজ্ঞ কমিটি পাঠানোর জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত গ্যাস লিকেজের সুনির্দিষ্ট উৎস ও কারণ এবং লিকেজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ছাড়া অন্য কোনো গ্যাস আছে কি না, থাকলে কী পরিমাণ রয়েছে, তা–ও জানা যায়নি। সেখানে গ্যাসের তীব্রতার কারণেই মূলত তদন্তকাজ শুরু করা যায়নি। গ্যাসের নমুনাও সংগ্রহও সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তাঁদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটির ভেতরে যে সব চেম্বারে এখনো গ্যাস রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে কী পরিমাণ গ্যাস রয়েছে আর কোন কোন জায়গায় গ্যাস রয়েছে, গ্যাসের প্রকৃতি, লিকেজের উৎস নির্ধারণ ও বন্ধের বিষয়ে সুপারিশ নির্ধারণের জন্য একটি বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে শিল্প মন্ত্রণালয়। বুয়েটের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। আজ থেকে তাঁরা কাজ শুরু করেছেন।

শফিউল আলম তালুকদার আরও বলেন, হাইড্রোজেন সালফাইড মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত এবং বাতাসের চেয়েও ভারী। ফলে এই গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে আর যেন কেউ মারা না যান, সে বিষয়টি খেয়াল রেখে তাঁরা তদন্ত কার্যক্রম করছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় তদন্ত কমিটির লোকজন এখনো দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটির ঘটনাস্থলে যেতে পারেনি। আগে দুর্ঘটনাস্থলের সম্ভাব্য সব স্থানের গ্যাস মুক্ত করা হবে। বিশেষজ্ঞ টিমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের দেশীয় বেসরকারি কোনো কোম্পানিকে গ্যাস মুক্ত করার জন্য ডাকা হতে পারে।

গত শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারির স্টেশন রোডের ফেরদৌস স্টিল কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর সেখানে থাকা শুভ জলদাস নামের এক শ্রমিক প্রথম আলোকে বলেছিলেন, জাহাজটির এলএনজি ট্যাংক কাটার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। জাহাজের তলায় থাকা একটি ট্যাংক কাটার কাজ চলছিল। ওই ট্যাক থেকেই বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।