জীবনযাপন

ক্যানসারজয়ী হোসনে আরার পুরো জীবনটাই সংগ্রামের

January 28, 2026
2 months ago
By SAJ
ক্যানসারজয়ী হোসনে আরার পুরো জীবনটাই সংগ্রামের

শরীয়তপুরের সাধারণ এক পরিবারের মেয়ে হোসনে আরা। পড়ালেখার সুযোগ মেলেনি। ১৯৮৮ সালে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর স্বামী চলে যান বিদেশ। ১৩-১৪ বছর পর দেশে ফেরেন। বিবাহিত হয়েও মাঝের এ সময় তাঁকে একাই টিকে থাকার লড়াই করতে হয়েছে। স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণের খরচটুকুও পাননি। তবে স্বামী ফিরে আসার পর বছর চারেক তাঁর সঙ্গে সংসার করেছেন। এরপর আবার বিদেশ চলে যান হোসনে আরার স্বামী। ফেরেন আড়াই বছর পর। জীবনে যেটুকু সময় সংসার করার সুযোগ পেয়েছিলেন হোসনে আরা, এলোমেলোই ছিল তাঁর জীবন। আর্থিক কষ্ট ছিল, ছিল ভালোবাসারও অভাব। স্বামী ছিলেন নেশাগ্রস্ত। কোলজুড়ে আসেনি কোনো সন্তান। স্বামীর সঙ্গেও এখন আর যোগাযোগ নেই। মোটের ওপর একা একাই জীবনটা পার করে দিলেন হোসনে আরা।

নিজের দায়িত্ব তাই নিজেই নিয়েছিলেন হোসনে আরা। ঢাকায় বয়স্ক মানুষের দেখাশোনার কাজ করেছেন সাড়ে ১১ বছর। করোনা অতিমারির সময় ফিরে যান শরীয়তপুরে। এক-দেড় বছর পর আবার ঢাকায় ফেরেন। একটি বাড়িতে রান্নার কাজ নেন। ২০২২ সালের অক্টোবরে হঠাৎ অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আগেই মেনোপজ হয়ে গিয়েছিল। তাহলে হঠাৎ এমন রক্তক্ষরণ কেন? পরেও মাঝেমধ্যে রক্তক্ষরণ হতো। হালকা জ্বরও থাকত।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পেরিয়ে যায়। সমস্যা সারে না। পুরুষ চিকিৎসকের কাছে গেলে সব সমস্যার কথা বলতে হবে ভেবে লজ্জা পেতেন খুব। পরে নারী চিকিৎসকের খোঁজ পেলেন। ২০২৩ সালের মার্চে একজন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা–বিশেষজ্ঞের কাছে গেলেন। চিকিৎসক সন্দেহ করলেন, তাঁর জরায়ুমুখের ক্যানসার হয়েছে। বায়োপসির পর নিশ্চিত হলো ক্যানসার। তত দিনে টু-বি স্টেজে চলে গেছে। পরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন হোসনে আরা। কিন্তু সেখানে জানা গেল, সিরিয়াল পাওয়া যাবে পরের বছর। বেসরকারি হাসপাতালে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেই খরচ জোগানোর মতো সামর্থ্য তাঁর নেই।

কী করবেন, বুঝতে না পেরে যখন দিশাহারা, শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশনের খোঁজ পেলেন হোসনে আরা। ফাউন্ডেশনটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতারের তত্ত্বাবধানে শুরু হলো চিকিৎসা। আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে বিনা মূল্যে চারটি কেমোথেরাপির ব্যবস্থা করা হয়। শরীয়তপুরে সরকারি অনুদানের জন্যও চেষ্টা করেছিলেন হোসনে আরা। তাঁর সে চেষ্টা সফল হয়নি। যে বাসায় কাজ করতেন, সেখান থেকে বেশ কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেন। কেমোথেরাপি চলার সময়ই ২৫টি রেডিওথেরাপি নেওয়া হলো মিরপুরের ডেলটা হাসপাতাল লিমিটেডে, আরও তিনটি বিশেষ ধরনের রেডিওথেরাপি (ব্র্যাকিথেরাপি) নিলেন। পরিবারের সদস্যরাও এই লড়াইয়ে তাঁর পাশে ছিলেন। চিকিৎসা চলাকালে বোনদের কাছে থাকতেন তিনি। ব্র্যাকিথেরাপির সময় বড় এক বোনের কাছে গাজীপুরে ছিলেন। ঢাকার রায়েরবাজারে ছোট বোনের কাছে ছিলেন বাকিটা সময়।

চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে কাজে ফিরেছেন হোসনে আরা। বলছিলেন, ‘জীবনে কখনো সুখ পাই নাই। কিন্তু ম্যাডাম (অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার) বলেছেন, এখন আর ক্যানসার নাই। সেই কঠিন রোগ থেকে আল্লাহ আমাকে ফিরায় আনছেন। যাঁরা আমাকে সাহায্য করছেন, সবার জন্য দোয়া করি আল্লাহর কাছে। এখনো ওই বাসাতেই কাজ করি। আগের মতো ভারী কাজ আর করতে পারি না।’ তিনি জানান, বয়সজনিত কিছু সমস্যায় ভুগছেন। গেল নভেম্বরে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তক্ষরণের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছিল। এখনো চিকিৎসকের নিয়মিত ফলোআপে আছেন। আর শত কষ্ট সত্ত্বেও আত্মনির্ভরশীল থাকার যুদ্ধে এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ৫৫ বছর (আনুমানিক) বয়সী এই নারী।