নির্বাচনের আগে অপপ্রচারের ‘বন্যা’, বেশির ভাগই ভারত থেকে
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রথম নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশ। অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যান এবং বর্তমানে সেখানকার হিন্দুত্ববাদী সরকারের আশ্রয়ে রয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি উন্নত মানের ছবিসহ অনলাইনে অপপ্রচারের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে এসব ভুয়া তথ্য নিয়ন্ত্রণে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে।
শান্তিতে নোবেলজয়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপপ্রচারের এক বিশাল বন্যা বয়ে যাচ্ছে।’
অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, ‘এসব অপপ্রচার বিদেশি সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় উৎস—উভয় দিক থেকেই আসছে।’
এ অপপ্রচারের এক বড় অংশজুড়েই রয়েছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার দাবি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অমুসলিম। তাঁদের অধিকাংশই সনাতন ধর্মাবলম্বী। অনলাইনে ‘হিন্দু জেনোসাইড’ (হিন্দু গণহত্যা) হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ব্যাপক হারে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে; যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আক্রমণের শিকার।
তবে জানুয়ারিতে প্রকাশিত পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ ছিল সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
‘ভারতের সমন্বিত অপপ্রচার’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে ৭ লাখের বেশি পোস্ট শনাক্ত করেছে। পোস্টগুলোতে ‘হিন্দু গণহত্যা’র দাবি করা হয়েছে।
গবেষণা সংস্থাটির প্রধান রকিব নায়েক বলেন, ‘আমরা অনলাইনে ভারতের সমন্বিত অপপ্রচার শনাক্ত করেছি; যেখানে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর বড় ধরনের সহিংসতার মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।’
রকিব নায়েক এএফপিকে বলেন, ‘এ কন্টেন্টগুলোর (আধেয়) ৯০ শতাংশের বেশি ভারতের উৎস থেকে তৈরি। বাকিগুলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার হিন্দুত্ববাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত।’
এএফপি ফ্যাক্ট চেক বেশ কিছু ভুয়া তথ্য উন্মোচন করেছে। এসবের মধ্যে আছে লাখোবার শেয়ার হওয়া কিছু কনটেন্ট। এআই দিয়ে তৈরি এমনই এক ভিডিওতে হাত হারানো এক নারীকে বিএনপিকে ভোট না দেওয়ার আবেদন করতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে একজন হিন্দু নারী দাবি করছেন যে জামায়াতে ইসলামীকে ভোট না দিলে হিন্দুদের ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে এএফপি ফ্যাক্ট চেক টিমের পাওয়া শত শত এআই ভিডিওর মধ্যে খুব কম ভিডিওতেই ‘এআই দিয়ে তৈরি’, এমন সতর্কবার্তা রয়েছে।
এ প্রবণতা এমন একটি পটভূমিতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে শেখ হাসিনার শাসনামলে বছরের পর বছর দেশে দমন–পীড়ন চলেছে, বিরোধীদের দমিয়ে রাখা ও ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে।
ঢাকার গবেষণা সংস্থা ডিজিটালি রাইটের প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘অন্য সময়ের তুলনায় এখন আমরা বিপুল পরিমাণ ভুয়া তথ্য দেখতে পাচ্ছি।’ তিনি জানান, বিনা মূল্যে পাওয়া এআই টুলগুলোর কারণে এখন উন্নত মানের ভুয়া তথ্য তৈরি করা অনেক সহজ হয়ে গেছে।
এমনকি এআই দিয়ে তৈরি আরেক ভিডিওতে বাংলাদেশিদের শেখ হাসিনার প্রশংসা করতে দেখা যায়। তিনি বর্তমানে পলাতক ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।
ভারতে আইপিএলের একটি ক্লাবে খেলা একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে হিন্দু উগ্রবাদীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের জেরে ক্লাবটি তাঁর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়। এ নিয়ে উত্তেজনা এতটা বাড়ে যে বাংলাদেশ জাতীয় দল ভারতে চলতি মাসের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব অপপ্রচারের বেশির ভাগই ভারত থেকে ছড়ানো হলেও এগুলো ভারত সরকার পরিকল্পিতভাবে করছে কি না, তার কোনো প্রমাণ নেই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা বাংলাদেশে ‘চরমপন্থীদের’ মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের ওপর ‘পরিকল্পিত হামলার ধরন’ লক্ষ করেছে। তবে তারা বাংলাদেশে ‘অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচনের পক্ষে তাদের অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
‘বড় হুমকি’
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, তাঁরা মেটার (ফেসবুকের মূল কর্তৃপক্ষ) সঙ্গে কাজ করছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণে একটি ইউনিট গঠন করেছেন। তবে অনলাইনে তথ্যের বিশাল ভান্ডার সামলানো এক অন্তহীন কাজ।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমাদের টিম যদি কোনো কন্টেন্ট ক্ষতিকর বা বিভ্রান্তিকর হিসেবে শনাক্ত করে, তবে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সেটিকে ভুয়া তথ্য হিসেবে ঘোষণা করি।’
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা জেসমিন তুলি বলেন, বাংলাদেশের জন্য এআই–জনিত ঝুঁকি অনেক বেশি।
সরকারি তথ্যমতে, শহরের ৮০ শতাংশ এবং গ্রামের প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবারে স্মার্টফোন রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহারে অনেকে এখনো নতুন।
জেসমিন তুলি সতর্ক করে বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি বড় হুমকি। কারণ, তথ্য যাচাই করার বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম। এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিওর কারণে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বিভ্রান্ত হতে পারেন।’