আন্তর্জাতিক

সরকারিরোধী বিক্ষোভে ইরানের প্রধান বিরোধী গোষ্ঠীগুলো কারা

January 13, 2026
4 months ago
By SAJ
সরকারিরোধী বিক্ষোভে ইরানের প্রধান বিরোধী গোষ্ঠীগুলো কারা

ইরানে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। দেশটির ধর্মীয় নেতাদের জন্য এই বিক্ষোভ এখন বড় চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে এই নেতারাই সেখানকার ক্ষমতার মসনদে আছেন।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সম্প্রতি এই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে সরকারবিরোধীরা বলছেন, নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আরও অনেক বেশি এবং এর মধ্যে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী রয়েছেন। তবে আল-জাজিরা কোনো পক্ষের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

একনজরে দেখে নেওয়া যাক ইরানের প্রধান বিরোধী গোষ্ঠী কোনগুলো—

ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর বর্তমান অবস্থা কী

বিক্ষিপ্ত আন্দোলনের মুখে চাপে আছে ইরানের সরকার। কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ইরানের ভেতরে থেকে এই আন্দোলনে যোগ দিলেও অনেকে দেশের বাইরে থেকে শাসকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তাঁরা মূলত নির্বাসিত নেতা অথবা প্রবাসী ইরানি।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা ইরানের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে রাস্তায় নামতে শুরু করেছেন।

বিক্ষোভের কোনো সুনির্দিষ্ট নেতা নেই কেন

অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশীয় রাজনীতির অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহ আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানে বর্তমানে এমন কোনো ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দল নেই, যারা সরকার গঠন করতে পারে। ইরানের ভেতরে ও বাইরের বিরোধী গোষ্ঠীগুলো বিচ্ছিন্ন, তাদের লক্ষ্যও ভিন্ন। কারও সুনির্দিষ্ট নেতা আছে, কারও নেই।

আকবরজাদেহ বলেন, বর্তমান বিক্ষোভ চলাকালে ইরানের ভেতর থেকে কোনো একক নেতা উঠে আসেননি। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, সুনির্দিষ্ট নেতা থাকলে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার ভয়।

২০০৯ সালের জুনে ইরানের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ বা সবুজ আন্দোলন ছিল মূলত পেশাজীবী, নারী অধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলন। দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিজয় ঘোষণার বিরুদ্ধে সেই আন্দোলন হয়েছিল।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী মীর-হোসেইন মুসাভি এই আন্দোলনের প্রতীকী নেতা ছিলেন। তবে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। আরেক সংস্কারপন্থী নেতা মেহেদি কারুবিও গৃহবন্দী ছিলেন, তবে গত বছরের মার্চে তার ওঁপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

বর্তমান বিক্ষোভে এই দুই নেতার তেমন কোনো প্রভাব নেই। আগে নেতাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের নজির থাকায় বিক্ষোভকারীরা এখন নিজেদের কোনো একক নেতার অধীনে সংগঠিত না করে নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছেন।

ছাত্র সংগঠন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পাড়া-মহল্লার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছোট ছোট অসংখ্য স্থানীয় দল ও নেতা তৈরি হয়েছে। ঠিক যেমনটি দেখা গেছে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনে ও সেপ্টেম্বরে নেপালের তরুণদের বিক্ষোভে।

বিরোধীদের মধ্যে কোন কোন গোষ্ঠী রয়েছে

ইরানের ভেতরে বর্তমানে চলমান সুসংগঠিত গণ-আন্দোলন ছাড়াও দেশ-বিদেশে বেশ কিছু শক্তিশালী বিরোধী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তাদের সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

রেজা পাহলভি ও রাজতন্ত্রপন্থীরা

৬৫ বছর বয়সী রেজা পাহলভি ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে ও সাবেক পাহলভি রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকারী। ১৯৫৩ সালে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাহের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব পর্যন্ত টিকে ছিল।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত পাহলভি ‘ইরান ন্যাশনাল কাউন্সিল’ নামের একটি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি সরাসরি রাজতন্ত্র ফেরানোর কথা না বলে একটি গণভোটের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন। তবে প্রজাতন্ত্রপন্থী ও বামপন্থীদের তীব্র বিরোধিতার কারণে এই ধারাটি বিভক্ত। প্রবাসীদের মধ্যে পাহলভির জনপ্রিয়তা থাকলেও ইরানের অভ্যন্তরে তাঁর সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

মরিয়ম রাজাভি ও পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন

মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন ছিল একটি শক্তিশালী বামপন্থী গোষ্ঠী। সত্তরের দশকে এটি শাহ সরকারের বিরুদ্ধে বেশ সক্রিয় ছিল। তবে ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরাকের পক্ষ নেওয়ায় ও সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন করায় অনেক ইরানি তাদের ঘৃণা করেন।

২০০২ সালে এরাই প্রথম ইরানের গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির তথ্য ফাঁস করেছিল। দলটির নেতা মাসুদ রাজাভি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে জনসমক্ষে নেই। বর্তমানে তাঁর স্ত্রী মরিয়ম রাজাভি দলটির হাল ধরেছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই দলটির বিরুদ্ধে অন্ধ আনুগত্যের নীতি মেনে চলা ও অনুসারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। তবে বর্তমানে ইরানের অভ্যন্তরে দলটির সক্রিয় উপস্থিতি তেমন একটা নেই।

সলিডারিটি ফর আ সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক ইন ইরান

২০২৩ সালে বেশ কিছু নির্বাসিত দল মিলে এই রাজনৈতিক জোট গঠন করে। ২০২২ সালে বাধ্যতামূলক হিজাব না পরার অভিযোগে ইরানের ‘নীতি’ পুলিশ মাসা আমিনি নামের এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করেছিল। পুলিশি হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হলে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়।

ওই সময় প্রবাসীদের মধ্যে জোটটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। তারা ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথককরণ, স্বচ্ছ নির্বাচন ও স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে কথা বলে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই জোটের তেমন কোনো জোরালো প্রভাব নেই।

কুর্দি ও বালুচ সংখ্যালঘু গোষ্ঠী

ইরানের প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে ১০ শতাংশ কুর্দি ও ২ শতাংশ বালুচ। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানে এই সুন্নি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই তেহরান সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। পশ্চিম ইরানে কুর্দিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। দীর্ঘকাল ধরে বেশ কিছু কুর্দিগোষ্ঠী সেখানে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সরকারের বিরোধিতা করে আসছে এবং মাঝেমধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়।

পাকিস্তানের সীমান্ত–সংলগ্ন সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে সুন্নি নেতারা আরও জোরালো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দাবি করছেন। সেখানে তেহরানবিরোধী কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতিও রয়েছে। ইরানের বড় যেকোনো গণ-আন্দোলনে কুর্দি ও বালুচ এলাকাগুলো সব সময়ই সবচেয়ে বেশি উত্তাল থাকে।