বাংলাদেশ

প্রদর্শনীর চিত্রকর্মে একাত্তরের চেয়ে চব্বিশকে বড় দেখানোর অভিযোগ, সমালোচনা

August 10, 2026
1 week ago
By SAJ
প্রদর্শনীর চিত্রকর্মে একাত্তরের চেয়ে চব্বিশকে বড় দেখানোর অভিযোগ, সমালোচনা

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত প্রদর্শনীর একটি চিত্রকর্মে মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে গণ-অভ্যুত্থানকে বড় করে দেখানো হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সমালোচনার মুখে চিত্রকর্মটি প্রদর্শনী থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গতকাল রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন চত্বরে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: রংতুলিতে মুক্ত স্বদেশ’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনীটি মঙ্গলবার রাত আটটা পর্যন্ত চলবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজনে এ প্রদর্শনীতে ৮০টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে।

যে চিত্রকর্ম নিয়ে অভিযোগ, সেখানে দেখা গেছে, একটি মুষ্টিবদ্ধ হাত একটি দাঁড়িপাল্লা ধরে আছে। দাঁড়িপাল্লার এক পাশে লাল রঙে ‘৭১’ এবং অন্য পাশে কালচে রঙে ‘২৪’ লেখা। ‘২৪’ লেখা পাল্লাটি নিচের দিকে কিছুটা ঝুঁকে আছে। এ উপস্থাপনার মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের তুলনায় ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ করেন কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী।

একাত্তরের পরাজিত শক্তি বরাবরই দুটো ইতিহাসকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল। তিনি বলেন, ‘আমরা বরাবরই বলে আসছি, চব্বিশ আর একাত্তরের তুলনা হয় না। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শক্তি বরাবরই দুটো ইতিহাসকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যা শেষমেশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ন্যারেটিভকে সার্ভ করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়োজিত চিত্র প্রদর্শনীতে এ রকম একটা বিষয় থাকে কী করে?’

এ ঘটনার মাধ্যমে ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অসম্মান করা হয়েছে মন্তব্য করে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘খুবই দুঃখজনক। ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়ে থাকলে এটি শুধু একটি শিল্পকর্মের বিকৃতি নয়, আমাদের ইতিহাস ও চেতনার প্রতিও অসম্মান। ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতা ও আত্মত্যাগের গৌরবময় অধ্যায়, যার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। একইভাবে ২০২৪-ও আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়, তারও যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। তবে ১৯৭১-কে হেয় বা আড়াল করে ২০২৪ কখনো বড় হয় না।’

একাত্তর ও চব্বিশ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনা। দুটি সময়কে মুখোমুখি না করে উভয়ের প্রেরণাকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান।

তবে চিত্রকর্মটির শিল্পী এটিকে আলংকারিক উপস্থাপনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই শিল্পী প্রথম আলোকে বলেন, খালি চোখে দেখলে মনে হতে পারে, চিত্রকর্মটিতে ২০২৪ সালের তুলনায় ১৯৭১-এর মর্যাদা কম দেখানো হয়েছে। কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য তা নয়।

শিল্পীর ভাষ্য, জুলাইয়ের পর থেকেই একটি গোষ্ঠী ২০২৪ সালকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। দাঁড়িপাল্লা ওজন মাপার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ‘২৪’-এর পাশে ছোট ছোট নুড়িপাথর দিয়ে পাল্লাটিকে ভারী দেখানো হয়েছে। এটি একটি আলংকারিক উপস্থাপনা, এর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা কমবেশি করার কোনো সম্পর্ক নেই।

চিত্রকর্মটি কীভাবে প্রদর্শনীর জন্য অনুমোদন করা হলো, জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, ডিনের অনুপস্থিতিতে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি শুধু একটি চিঠিতে সই করেছেন। ছবিগুলো যাচাই না করেই পাঠানো হয়েছিল।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল আলীম বলেন, তিনি বিষয়টি অনলাইনে কিছুটা দেখেছেন। পুরো বিষয়টি জেনে পরে কথা বলবেন। তবে তাঁর মতে, ‘একাত্তর আমাদের সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্বের লড়াই। আর চব্বিশ ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই। দুটি কখনোই এক হতে পারে না।’

সমালোচনার পর আজ সোমবার চিত্রকর্মটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ প্রশাসক অধ্যাপক এস এম কামরুজ্জামান। তিনি জানান, অনুষ্ঠানটি মূলত চারুকলা অনুষদের তত্ত্বাবধানে হয়েছে এবং তাঁদের দায়িত্ব ছিল সিনেট ভবনে প্রদর্শনীর জায়গা নির্ধারণ করা। কোনো বিতর্কিত বিষয়কে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রশ্রয় দেবে না।