বাংলাদেশ

পর্যটক বাড়ছে, সেন্ট মার্টিন ঝুঁকিতে

October 29, 2026
1 day ago
By SAJ
পর্যটক বাড়ছে, সেন্ট মার্টিন ঝুঁকিতে

প্রাণপ্রকৃতি রক্ষায় সেন্ট মার্টিনে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার পর্যটক যাওয়ার সীমা ছিল। এবার তা বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করেছে সরকার। রাতযাপনের সুযোগও দুই মাস থেকে বাড়িয়ে সাড়ে চার মাস করা হয়েছে। কিন্তু দ্বীপের পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রাণপ্রকৃতি বাড়তি চাপ কতটা নিতে পারবে, তা নির্ধারণে হালনাগাদ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

সেন্ট মার্টিন প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। পর্যটক বাড়লে সুপেয় পানির চাহিদার পাশাপাশি বাড়বে পয়োবর্জ্য, আবর্জনা ও সৈকতে মানুষের আনাগোনা। এসব চাপ বিবেচনায় নিয়ে নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশকর্মীরা। তাঁদের মতে, আগের দুই হাজার পর্যটকের চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থাই দ্বীপে গড়ে ওঠেনি। সেখানে আরও দেড় হাজার পর্যটক বাড়ানো হলে প্রাণপ্রকৃতি নতুন ঝুঁকিতে পড়বে।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটকেরা যেতে পারবেন। প্রত্যেককে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে ১০০ টাকা। পর্যটকদের রাতযাপন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় গত মঙ্গলবার নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, ১ নভেম্বর থেকেই রাতে থাকা যাবে। আগে শুধু ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাতযাপনের সুযোগ ছিল।

১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ ও বারবিকিউ নিষিদ্ধ। কেয়াবন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। পর্যটক বাড়ানোর পাশাপাশি এসব বিধিনিষেধ কার্যকরে নজরদারি কতটা বাড়ানো হবে, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের যাতায়াত সীমিত করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই তিন মাস অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিদিন দুই হাজার পর্যটক দ্বীপটিতে যাওয়ার সুযোগ পেতেন। বছরের বাকি সময় দ্বীপটি প্রায় পর্যটকশূন্য থাকত। গত দুই মৌসুমে ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক দ্বীপটি ভ্রমণ করেছেন, যা তিন বছর আগের তুলনায় অর্ধেকের কম। এতে পরিবেশগত সুফলও পাওয়া গেছে।

পর্যটন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্বীপের বাসিন্দাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগও নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এ জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এর আওতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং পর্যটনের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নির্দিষ্টসংখ্যক পরিবারকে দুই মাসের জন্য আর্থিক অনুদান দেওয়ার উদ্যোগ ছিল। এ ছাড়া সেন্ট মার্টিনের জন্য একটি মহাপরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক ও প্রকৃতিবান্ধব পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র প্রথম আলোকে জানায়, প্রতিদিন অন্তত ছয় হাজার পর্যটক যাওয়ার সুযোগ চেয়েছিলেন জাহাজমালিক ও হোটেল-রিসোর্টের মালিকেরা। আলোচনার পর তা কমিয়ে সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে।

পর্যটক বাড়ানোর বিষয়ে জানতে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ব্যস্ত থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাঁর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেনের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও জবাব পাওয়া যায়নি। মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা খানম দেশের বাইরে আছেন। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের পাশাপাশি লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।

কয়েক দশকের অপরিকল্পিত পর্যটন ও অবাধে স্থাপনা নির্মাণের কারণে সেন্ট মার্টিনের প্রাণপ্রকৃতি বিপর্যস্ত হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দ্বীপজুড়ে একের পর এক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে ওঠে। অনেক স্থাপনার পরিবেশ ছাড়পত্র ও অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদনও ছিল না। পর্যটকের সংখ্যারও কোনো সীমা ছিল না। ফলে পর্যটকের ভিড়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে প্লাস্টিকসহ অন্যান্য বর্জ্য। দূষিত হয় সৈকত ও আশপাশের সমুদ্র।

পরিবেশকর্মীদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের সুফল পেতে শুরু করেছিল দ্বীপটি। পর্যটকের আনাগোনা কমায় সৈকতে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা কমে। পর্যটন বন্ধ থাকার সময়ে সামুদ্রিক পানির মানের উন্নতির ইঙ্গিতও পাওয়া যায় গবেষণায়। দীর্ঘদিনের দূষণ ও মানুষের অবাধ বিচরণের চাপ থেকে প্রাণপ্রকৃতির কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

এখন পর্যটকের দৈনিক সীমা একলাফে ৭৫ শতাংশ বাড়ানোয় সেই সুফল ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাড়তি পর্যটকের কারণে হোটেল-রিসোর্টে পানির ব্যবহার বাড়বে। বাড়বে পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিকের বোতল ও খাবারের মোড়ক। বর্জ্য শোধন ও অপসারণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে এসবের দূষণ সৈকত ও সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়বে। একই সঙ্গে প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের আনাগোনাও বাড়বে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, দ্বীপের পরিবেশগত বহনক্ষমতা বিবেচনায় দিনে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ পর্যটক যাওয়া যুক্তিসংগত। অথচ সুপেয় পানির সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়িয়েই এবার পর্যটকের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে। পর্যটক বাড়ানোর আগে দ্বীপ কতটা চাপ নিতে পারবে, তার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন ছিল।

প্রবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের সংবেদনশীলতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কক্সবাজারে গণপর্যটনের সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু সেন্ট মার্টিনে একই ব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পর্যটকদের বিনোদনের জন্য দ্বীপের প্রাণপ্রকৃতিকে ঝুঁকিতে ফেলা যায় না। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো হলে পরিবেশের ক্ষতিই হবে।

সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ এবং দেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একসময় দ্বীপটিতে প্রায় ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য ছিল। প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম, শৈবাল, শামুক-ঝিনুক ও নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস ছিল এটি। গত দুই দশকে প্লাস্টিক দূষণ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে অনেক প্রজাতি হারিয়ে গেছে।

পর্যটকের চাপ কমলে সেন্ট মার্টিনের পরিবেশের উন্নতি হয়, এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। ২০২৬ সালের মে মাসে জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটন বন্ধ থাকার সময়ে সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষকেরা একে সামুদ্রিক পরিবেশের উন্নতির লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অতীতে পর্যটক ও রাতযাপনের সীমা নির্ধারণে পরিবেশ অধিদপ্তর, সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যুক্ত ছিল। এবার রিসোর্টের মালিক ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অনুরোধে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তাঁর মতে, পরিবেশগত বিবেচনায় পর্যটকের সংখ্যা কমতে পারে, বাড়ানোর সুযোগ নেই। তা ছাড়া পর্যটকদের কাছ থেকে আদায় করা ১০০ টাকা কোথায় ব্যয় করা হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

আগের দুই হাজার পর্যটকের সীমা কার্যকর করতেই প্রশাসনকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল বলে জানান সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তাঁর প্রশ্ন, এখন সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের ওপর কার্যকর নজরদারি কীভাবে সম্ভব?