অর্থনীতি

সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমালে সরকারের লাভ কী, বিনিয়োগকারীর ক্ষতি কতটা

January 3, 2026
3 months ago
By SAJ
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমালে সরকারের লাভ কী, বিনিয়োগকারীর ক্ষতি কতটা

নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো ৮-৯ শতাংশের ঘরেই আছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়েছে সরকার। বিদায়ী বছরের তুলনায় চলতি বছর সঞ্চয়পত্রে ১ লাখ টাকা বিনিয়োগে প্রতি মাসে মুনাফা কমবে ১১০ টাকা। এর মানে, বছরে কমবে ১ হাজার ৩২০ টাকা। কেউ যদি সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন তাহলে চলতি বছরে মুনাফা ৬ হাজার ৬০০ টাকা কম পাবেন।

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর কারণে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে যাঁদের পারিবারিক খরচের একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আসে, তাঁরা আরও চাপে পড়বেন। অনেকেই বলছেন, সঞ্চয়পত্রে মুনাফা কমানোর কারণে সরকারের ঋণ ব্যয় সামান্য কিছু কমবে। তারপরও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনীতিতে শ্লথগতির এই সময়ে সরকার কেন সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমালে সরকারের কী লাভ আর বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি কতটা, সেটি নিয়ে প্রশ্ন-উত্তরভিত্তিক এই এক্সপ্লেইনার।

প্রশ্ন: প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক, এই দফায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার কতটা কমল।

উত্তর: সরকার সাধারণত ছয় মাস পরপর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পর্যালোচনা করে। ছয় মাস আগে এক দফা কমানোর পর সে ধারাবাহিকতায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (ইআরডি) গত ১ জানুয়ারি আবারও সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়েছে, যা আগামী ছয় মাস কার্যকর থাকবে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন মুনাফার হার ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ হবে। বিদায়ী বছরের শেষ ছয় মাস সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ সুদহার ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও সর্বনিম্ন সুদহার ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ ছিল।

প্রশ্ন: কোন সঞ্চয়পত্রে কত সুদহার দাঁড়াল?

উত্তর: জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র ও পরিবার সঞ্চয়পত্র। এর বাইরে চার ধরনের সঞ্চয় বন্ড ও পোস্ট অফিস সঞ্চয় ব্যাংকে তিন ধরনের পণ্য আছে।

সঞ্চয়পত্রের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। এই সঞ্চয়পত্রে এত দিন সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ; এখন তা কমিয়ে করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ফলে ১ লাখ টাকা বিনিয়োগে যেখানে মুনাফা পাওয়া যেত ৯৪৪ টাকা সেখানে এখন থেকে ১১০ টাকা কম অর্থাৎ ৮৩৪ টাকা পাওয়া যাবে। অন্যদিকে সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ, সেটি কমিয়ে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ করা হয়েছে।

পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফা ছিল ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ; এখন তা কমিয়ে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ করা হয়েছে। সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারও কমানো হয়েছে। এ সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ, তা হবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। এ ছাড়া তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলেও মুনাফা কমবে। এ সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

প্রশ্ন: গত বছর বা তার আগে বিনিয়োগ করা সঞ্চয়পত্রের সুদহার কি কমবে?

উত্তর: চলতি বছরের ১ জানুয়ারির আগে ইস্যু হওয়া সব জাতীয় সঞ্চয় স্কিম ইস্যুকালে মুনাফার যে হার ছিল সেটিই প্রযোজ্য হবে। তবে পুনর্বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন তারিখের মুনাফার হার প্রযোজ্য হবে। ছয় মাস পর মুনাফার হার বাড়তে বা কমতে পারে।

প্রশ্ন: সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমায় বিনিয়োগকারীদের কতটা ক্ষতি হলো?

উত্তর: সঞ্চয়পত্রের গ্রাহক মূলত দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। বিপদের সময় সঞ্চয়পত্র ভেঙে তারা আর্থিক সমস্যা সামাল দেয়। অনেক পরিবারের প্রতি মাসের সংসার খরচের একটি অংশ অবশ্য সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আসে। ফলে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমলে মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ বাড়ে। ধরা যাক, একটি পরিবারের ১০ লাখ টাকার বিনিয়োগ আছে পরিবার সঞ্চয়পত্রে।

চলতি মাসেই তাদের সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পূর্ণ হবে। তারপর পুনর্বিনিয়োগ করতে হবে পরিবারটিকে। এত দিন পরিবারটি প্রতি মাসে ৯ হাজার ৪১ টাকা মুনাফা পেত। এখন সুদহার কমে যাওয়ায় মুনাফা কমবে ১ হাজার ১০০ টাকা। পরিবারটি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতি মাসে মুনাফা পাবে ৮ হাজার ২৪১ টাকা।

প্রশ্ন: সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তো কমছে, তাহলে কোনো ব্যাংকে এফডিআর খুললে বা স্থায়ী আমানত রাখলে কি মুনাফা মিলবে?

উত্তর: এতক্ষণ যে পরিবারটির কথা আমরা বলছিলাম; সেই পরিবার যদি সঞ্চয়পত্রেপুনর্বিনিয়োগ না করে ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রাখতে যায় তাহলে মুনাফা কী পাবে, তা দেখে নেওয়া যাক। বর্তমানে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকে ৯০ দিন বা তিন মাসের এফডিআরের সুদহার ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। ওই পরিবারটি যদি ১০ লাখ টাকা এফডিআর করে তাহলে তিন মাস শেষে মুনাফা পাবে ২৩ হাজার ১২৫ টাকা।

ন্যূনতম ১০ শতাংশ কর বাদ দিলে পরিবারটি পাবে ২০ হাজার ৮১২ টাকা। তার মানে, প্রতি মাসে ওই পরিবার মুনাফা পাবে ৬ হাজার ৯৩৭ টাকা। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্রের চেয়ে ১ হাজার ৩০৪ টাকা মুনাফা কম পাবে। কোনো ব্যাংক যদি আরও বেশি সুদহার দেয় তাহলে মুনাফা কিছুটা হয়তো বাড়বে।

প্রশ্ন: সরকার কেন বারবার সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমাচ্ছে?

উত্তর: সরকার বাজেট–ঘাটতি পূরণে যেসব অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়, তার মধ্যে সঞ্চয়পত্র অন্যতম। তবে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি হওয়ায় তা সরকারের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সঞ্চয়পত্রের বাইরে তুলনামূলক কম সুদের ট্রেজারি বন্ড ও বিল থেকে ঋণ নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে সরকার।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। তাতে ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ছিল ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) নিট সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগ বেড়েছে ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। তার মানে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার কম ঋণ নিচ্ছে।

অবশ্য সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর পেছনে আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে—ব্যাংকে সাধারণ মানুষের আমানত বাড়ানো। এ জন্য ব্যাংকের আমানতের কাছাকাছি সুদহার নির্ধারণ করা হচ্ছে সঞ্চয়পত্রের। মনে করা হচ্ছে, ব্যাংকে আমানত বাড়লে ধীরে ধীরে ঋণের সুদ কমতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতিও নিম্নমুখী হবে।

ব্যাংক খাত থেকে যে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর দাবি উঠেছে, সেটি গত মাসে প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর বিষয়ে তিনি তখন বলেছিলেন, ‘...বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির স্বার্থে ব্যাংকারদের দিক থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কিছুটা কমানোর একটা দাবি আছে। সার্বিক স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’