বাংলাদেশ

শরীয়তপুরে একই অ্যাম্বুলেন্স চক্র, একই ‘কৌশলে’ জিম্মি, আবার রোগীর মৃত্যু

January 14, 2026
4 months ago
By SAJ
শরীয়তপুরে একই অ্যাম্বুলেন্স চক্র, একই ‘কৌশলে’ জিম্মি, আবার রোগীর মৃত্যু

শরীয়তপুরে একটি অ্যাম্বুলেন্স চক্রের কাছে জিম্মি রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। গত বছরের আগস্টে অ্যাম্বুলেন্স ‘আটকে’ রাখায় এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। পরে চক্রের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হলেও রোগী জিম্মি করার ঘটনা বন্ধ হয়নি।

নবজাতক মৃত্যুর ওই ঘটনার পাঁচ মাসের মাথায় গত মঙ্গলবার সদর হাসপাতাল থেকে এক রোগীকে ঢাকায় নেওয়ার পথে দুই দফায় দেড় ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে। এতে ঢাকায় হাসপাতালে নেওয়ার আগেই ওই অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রোগীর মৃত্যু হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।

গত বছরের ১৪ আগস্ট ওই নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় জেলা সিভিল সার্জনের গাড়িচালক আবু তাহের ও শরীয়তপুর স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক গাড়িচালক আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁরা অ্যাম্বুলেন্স চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ। এবার একই চক্রের সদস্য ও নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি সুমন খানের নেতৃত্বে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার ঘটনা ঘটল।

শরীয়তপুরে ৫০ শয্যার ৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ২০ শয্যার ১টি থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ১০০ শয্যার ১টি জেলা সদর হাসপাতাল রয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার হাসপাতালগুলো থেকে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। জেলায় সরকারি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ৭টি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ জনের বেশি রোগী জেলার বাইরে বহন করা হয় না। অন্য রোগীদের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ওপর নির্ভর করতে হয়।

রোগীর স্বজন, চালক ও স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকার ও হাসপাতালের রোগীদের ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় নেওয়ার কাজ করছে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চক্র। এ চক্রের ২৭টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছে শরীয়তপুর স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক গাড়িচালক আবদুল হাই মোল্যা ও সিভিল সার্জনের গাড়িচালক আবু তাহের দেওয়ান। আবু তাহেরের ছেলে রহিম দেওয়ান বাবার হয়ে কাজ করেন। এই তিনজনই নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকায় নেওয়ার জন্য চার হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। আর ওই চক্রের অ্যাম্বুলেন্স নিলে ভাড়া দিতে হচ্ছে সাত–আট হাজার টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের একজন চালক প্রথম আলোকে বলেন, আগে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চক্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মী ও আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এক সংসদ সদস্যের চাচাতো ভাইয়ের হাতে। ২০২৫ সালের পর সেটি চলে যায় স্বাস্থ্য বিভাগের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক গাড়িচালকের হাতে।

ওই চালক আরও বলেন, শরীয়তপুর অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালক কল্যাণ সমিতির নামে ওই চক্র অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করে। তারাই ঠিক করে দেয় কোন গাড়ি কখন রোগী তুলবে, কত ভাড়া নেওয়া হবে। এটার অন্যথা হলেই বিপত্তি।

সিভিল সার্জনের গাড়িচালক তাহেরের একটি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। সেটি চালান তাঁর ছেলে রহিম। রহিমের নেতৃত্বে গত বছরের অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখায় নবজাতকের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ। ওই ঘটনায় তাহের, রহিমসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নবজাতকের বাবা নূর হোসেন সরদার। অন্য দুই আসামি হলেন স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক গাড়িচালক আবদুল হাই ও অ্যাম্বুলেন্সচালক বিল্লাল মুন্সি। পুলিশ তদন্ত শেষে গত ৩১ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এতে ওই চার আসামি ছাড়াও চক্রের সদস্য সুমন খানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নূর হোসেন সরদার ঢাকায় থাকেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ছোটখাটো কাজ করি। মামলা পরিচালনা করার মতো আর্থিক সঙ্গতিও নেই। যদি সরকার মামলাটি চালায়, তাহলে হয়তো অপরাধীরা শাস্তি পাবে। আমিও চাই আমার সন্তানের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের শাস্তি হোক।’

নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সিভিল সার্জন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনও দাখিল করেছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো কর্মীর সংশ্লিষ্টতা পায়নি কমিটি।

সিভিল সার্জনের গাড়িচালক আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছর যে মামলা হয়েছিল, তাতে আমরা জামিনে আছি। আর ওই ঘটনায় আমার সম্পৃক্ততা নেই, তা স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্ত কমিটির কাছে জানিয়েছিলাম।’ তিনি কোনো অ্যাম্বুলেন্স চক্রের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন।

একই দাবি করেন শরীয়তপুর অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আবদুল হাই মোল্যা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগের একটি ঘটনায় আমার বিরুদ্ধে মামলা চলছে। চেষ্টা করছি সেটি মীমাংসা করার জন্য।’

মঙ্গলবার ঢাকায় নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্স ‘আটকে’ রাখায় ওই অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রোগী জমশেদ আলী ঢালী (৭০) মারা যান। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চক্রের সদস্য সুমনের নেতৃত্বে ৮ থেকে ১০ জন ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কের কোটাপাড়া ও জামতলা এলাকায় দুই দফায় দেড় ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখেন। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাঁরা মুক্ত হয়ে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে নেওয়ার পথে বিকেল চারটার দিকে জমশেদ মারা যান।

সুমনের সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা অ্যাম্বুলেন্স চক্রের সদস্য। কেউ মালিক, কেউবা চালক।

জানতে চাইলে সুমন মুঠোফোনে প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তিনি অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখেননি। কারা রেখেছিলেন, তা–ও জানেন না। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু ওই অ্যাম্বুলেন্সের চালকের কাছে মুঠোফোনে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি কেন সদর থেকে রোগী উঠিয়েছেন।’

ঢাকায় নেওয়ার পথে রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখায় রোগী মারা গেছেন বলে শুনেছেন বলে জানান শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন রেহান উদ্দিন। তিনি বলেন, ওই ঘটনা নিয়ে জেলা প্রশাসক একটি সভা ডেকেছেন। আর গত বছরের ঘটনাটি তদন্ত করার পর স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে জানিয়ে জমশেদ আলীর নাতি জুবায়ের হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সামান্য কয়েকটি টাকার জন্য এই লোকগুলো একজন মুমূর্ষু রোগীর অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেবে, তা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি।’