শিক্ষা

উত্তরপত্র মূল্যায়নে এত ভুল কেন, মূল্যায়নব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

September 10, 2026
1 month ago
By SAJ
উত্তরপত্র মূল্যায়নে এত ভুল কেন, মূল্যায়নব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রতি বছরই পুনর্নিরীক্ষণে কিছু পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়; কিন্তু এবার শুধু আবেদনকারীর সংখ্যাই রেকর্ড হয়নি, ফল পরিবর্তনের সংখ্যাও আগের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পুনর্নিরীক্ষণের পাশাপাশি এবার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন। প্রথম ফল প্রকাশের সময় ফেল করা ৪ হাজার ৫৮৫ পরীক্ষার্থী এখন পাস করেছে। গতবার এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২০৭। অর্থাৎ এবার ফেল থেকে পাস করার সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি।

এ ছাড়া ফল বা গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের এবং নম্বর পরিবর্তন হয়েছে ৫৬ হাজার ২৫৯ জনের। ফল পুনর্নিরীক্ষণের পর এত ব্যাপক পরিবর্তন কেবল পরীক্ষার্থীদের ফল সংশোধনের ঘটনা নয়; এটি এসএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় উত্তরপত্র মূল্যায়নব্যবস্থার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রথম দফায় উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় পরীক্ষকদের দেওয়া নম্বর কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

এ বিষয়ে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান আজ প্রথম আলোকে বলেন, এবার ফল পরিবর্তনের সংখ্যা বেশি হওয়ার একটি কারণ হলো পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়ন—দুটি বিষয় একসঙ্গে করা হয়েছে। আগে পুনর্নিরীক্ষণেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হতো। এবার পুনর্নিরীক্ষণের পাশাপাশি পুনর্মূল্যায়ন হওয়ায় পরিবর্তনের সংখ্যা বেশি হয়েছে।

তবে পুনর্মূল্যায়নে এত বেশি পরিবর্তন হওয়া উচিত নয় উল্লেখ করে সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ব্যক্তিবিশেষে মূল্যায়নে কিছু পার্থক্য হতে পারে। এবার পুনর্মূল্যায়নের কাজ করতে শিক্ষকেরা অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন। তাঁরা টানা ১১ দিন কাজ করেছেন বলেই কাজটি শেষ করা সম্ভব হয়েছে। বিধি অনুযায়ী প্রথম দফায় মূল্যায়নের সময় যেসব উত্তরপত্রে ‘অনুচিত’ নম্বর পাওয়া গেছে, সেই পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ এবারই

এত দিন শিক্ষা বোর্ডের নিয়মে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ ছিল না। আবেদনকারী পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ করে মূলত প্রাপ্ত নম্বরের যোগ-বিয়োগে কোনো ভুল হয়েছে কি না, তা দেখা হতো। এবার সেই ব্যবস্থার সঙ্গে পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। এতে ফল পরিবর্তনের পরিসরও বেড়েছে।

গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘদিন তুলনামূলক উচ্চ পাসের হার থাকার পর দুই বছর ধরে এসএসসির ফল কিছুটা নিম্নমুখী। এবার শুধু ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশে, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন; আর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।

ফলের এই নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেই পুনর্নিরীক্ষণের পর হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর গ্রেড ও ফল পরিবর্তন হওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথম ফল প্রকাশের সময় যে পরীক্ষার্থীকে অকৃতকার্য বলা হয়েছিল, পুনর্মূল্যায়নের পর তাঁরই পাস করার ঘটনা মূল্যায়নের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে।

নম্বর বদলেছে ৫৬ হাজারের বেশি

ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণের জন্য অনলাইনে ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়। শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি। তাঁদের মধ্যে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ৪ লাখ ২ হাজার ৫২ পরীক্ষার্থী উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছিল। তাঁদের আবেদনের আওতায় ছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৮টি স্ক্রিপ্ট (পত্র)।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট মনজুরুল কবীর প্রথম আলোকে জানান, গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের; আর নম্বর পরিবর্তন হয়েছে ৫৬ হাজার ২৫৯ জনের। ফেল থেকে পাস করেছে ৪ হাজার ৫৮৫ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন।

যোগ-বিয়োগের ভুলও নিয়মিত

এত দিন পুনর্নিরীক্ষণে মূলত নম্বর গণনার ভুল সংশোধন করা হতো। এ ক্ষেত্রেও প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। শুধু ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৭২৩ জন, ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৮৫ জন, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭২৩ জন এবং ২০২৫ সালে ২ হাজার ৯৪৬ জনের ফল পরিবর্তন হয়েছিল। আর এবার শুধু ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেই গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ৮ হাজার ৯৯৯ জনের।

প্রতিবছর পুনর্নিরীক্ষণের পর ফল পরিবর্তনের ঘটনা ঘটলেও এবার পরিবর্তনের ব্যাপকতা বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে গ্রেড পরিবর্তন, ফেল থেকে পাস এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পাওয়ার মতো ঘটনা শুধু ফল তৈরির কারিগরি ত্রুটির প্রশ্ন নয়, উত্তরপত্র মূল্যায়নের মান নিয়েও ভাবার কারণ তৈরি করেছে।

সময়ের চাপ, মূল্যায়নের মান

বর্তমানে ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের প্রথা থাকায় পরীক্ষকদের অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে হয়। সঠিক মূল্যায়নের জন্য এই সময় কম বলে অভিযোগ আছে। একদিকে দ্রুত ফল প্রকাশের চাপ, অন্যদিকে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র দেখার দায়িত্ব—দুটির কারণে মূল্যায়নে তাড়াহুড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর সঙ্গে কোনো কোনো পরীক্ষকের যেনতেনভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের অভিযোগ যুক্ত হলে সমস্যাটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

পুনর্মূল্যায়নের পর ফল পরিবর্তনের এই চিত্র তাই শুধু এবার কতজনের নম্বর বা গ্রেড বদলেছে, সেই হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন পরীক্ষার্থীর একটি নম্বরও তার পাস-ফেল, গ্রেড কিংবা জিপিএতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষায় মূল্যায়নের ভুলে কোনো পরীক্ষার্থী যাতে ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময়, পদ্ধতি ও পরীক্ষকদের জবাবদিহি—সবকিছুই গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আমিরুল আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, আগে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ ছিল না। কেবল নম্বর গণনায় ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করা হতো। ফলে উত্তরপত্র মূল্যায়নে ভুল থাকলেও তা প্রতিরোধ বা সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। শিক্ষা বোর্ডে ৯ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, অনেক ক্ষেত্রে উত্তরপত্র মূল্যায়নে সমস্যা থাকলেও নিয়ম না থাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত না বা উত্তরপত্রে কিছু করা যেত না।

আমিরুল আলম খান বলেন, এখন পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থাটি করা হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে সেই কাজটি কতটা সততার সঙ্গে করা হচ্ছে, সেটিই মূল বিষয়। আশা থাকবে, কাজটি যত্নসহকারে করা হবে, যাতে মূল্যায়নের ত্রুটির কারণে কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।