ভিডিওগুলো এআই দিয়ে তৈরি, অপপ্রচার চলছে, ব্যবস্থা নেই
মধ্যবয়সী এক নারী। একটি হাত নেই। উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন নামের একটি ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি ভিডিওতে তিনি বলছেন, একটি দলের নেতারা প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন; কিন্তু কার্ড দেননি। তিনি আরও বলছেন, এই ঘুষখোর দলকে তিনি আর ভোট দেবেন না। ভোট দেবেন কোন দলকে, সেটাও তিনি বলেছেন।
ভিডিওটি সত্যি নয়। প্রথম আলো যাচাই বা ফ্যাক্ট চেক করে দেখেছে, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। তবে হাত না থাকা নারীর চেহারার সঙ্গে মিল আছে ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে হাত হারানো পোশাক কারখানার শ্রমিক রিক্তার।
উত্তরবঙ্গ টেলিভিশনের ফেসবুক পেজে ভিডিওটি দেওয়া হয় ১০ জানুয়ারি। গতকাল রোববার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টা পর্যন্ত ভিডিওটির ভিউ বা দেখা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ বার। ভিডিওটির নিচে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। মন্তব্য পড়েছে ১ হাজার ২০০। শেয়ার হয়েছে ২১ হাজার বারের বেশি।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন নামের পেজটির ফলোয়ার বা অনুসারীর সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি (গতকাল সন্ধ্যায় দাঁড়ায় ১ লাখ ৬ হাজারে)। সাতজন ‘অ্যাডমিন’ (যাঁরা পেজ পরিচালনা করেন) বাংলাদেশ থেকে এটি পরিচালনা করেন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে ভোটারকে বিভ্রান্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো আধেয় বা কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করা নিষিদ্ধ। রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী যেমন এটা পারবেন না, তেমনি প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তা নিষিদ্ধ।
অবশ্য এই নিষিদ্ধ প্রচার নির্বিঘ্নে চলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো দলের পক্ষে এআই দিয়ে তৈরি সেনা কর্মকর্তার ভিডিও ছেড়ে কোনো দলকে ভোট দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কোনো ক্ষেত্রে বিকিনি পরা নারী বলছেন, তিনি একটি দলকে ভোট দেবেন, যেটি ইসলামপন্থী দল। এভাবে ভোট চাওয়া ওই দলের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এআই ভিডিও তৈরি করেও একটি দলের সমালোচনা, আরেকটি দলের পক্ষে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। বানরের মুখ দিয়ে একটি দলের পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
কত ভিডিও ছড়িয়েছে, সেগুলো কত মানুষ দেখেছে, কত শতাংশ মানুষ এসব ভিডিও বিশ্বাস করেছে, তার কোনো হিসাব নেই। কারণ, এমন কোনো গবেষণা হয়নি। তবে ভিডিওগুলোর ‘ভিউ’ হাজার হাজার। তা থেকে ধারণা করা যায়, এগুলোর দর্শক বহু মানুষ।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৯৯ লাখ (সর্বশেষ ৯০ দিনের মধ্যে একবার ব্যবহার করলেই গ্রাহক হিসেবে ধরা হয়)। হ্যাশমেটা নামের একটি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী সাড়ে ৪ কোটির বেশি হতে পারে। টিকটক ব্যবহারকারী দেড় থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ হতে পারে। ইউটিউব ব্যবহারকারী হতে পারে সাড়ে ৩ কোটির মতো।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন গত ১২ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এআই ব্যবহার করে অসত্য তথ্য ছড়ানো বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অসত্য তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার দিন দিন বেড়ে চলেছে। আইন অনুযায়ী এসব রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অবশ্য এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে জানতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে জানানো হয়, বিষয়টি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা নাগরিকদের কাছ থেকে কমপ্লেন (অভিযোগ) নেওয়ার জন্য চারটি ই-মেইল ও একটি হটলাইন নম্বর চালু করেছি। সেখান থেকে যে রিপোর্টগুলো পাচ্ছি, সেগুলো প্রসেস (প্রক্রিয়া) করছি।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু ২২ জানুয়ারি। এর আগে কোনো প্রতীকে ভোট চাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতীক এখনো বরাদ্দ হয়নি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার চলছে, নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নির্বাচনবিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মো. আব্দুল আলীম প্রথম আলোকে বলেন, প্রতীক বরাদ্দের আগে অনলাইনে প্রচার চালানো যাবে কি না, তা নিয়ে আইনে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা নেই। পরিস্থিতির উদ্ভব হলে নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারে। সে রকম ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার নিষিদ্ধ। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিস্থিতি কীভাবে খারাপ হতে পারে, জানতে চাইলে আব্দুল আলীম বলেন, ‘ধরেন কোনো প্রার্থীকে হেয় করে কোনো এআই ভিডিও ছড়ানো হলো, সেটা তো ওই প্রার্থীর লোকজন সহ্য করবে না। তখন সহিংসতা হবে। আবার কোনো প্রার্থীর এআই ভিডিও তৈরি করে বলা হলো, তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তখন কী হবে?’
ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পোশাক পরা এক ব্যক্তি একটি দলের পক্ষে বলছেন। যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি। গতকাল পর্যন্ত ভিডিওটি ১০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। ভিডিওতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ৮৯ হাজারের বেশি। মন্তব্য পড়েছে আড়াই হাজার। শেয়ার করা হয়েছে ২৬ হাজার বার।
সেনাবাহিনীও ১৪ জানুয়ারি এআই দিয়ে তৈরি এ ধরনের ভিডিও নিয়ে সতর্কতা জারি করে। সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, একটি স্বার্থান্বেষী মহল সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট ও বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে। এসব অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
সেনাবাহিনী সতর্ক করার পর চার দিন হয়েছে। ভিডিওটি রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে এআইয়ের অপব্যবহারের বিষয়টি তুলেছে; কিন্তু ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম। সেখানে কে কী করে, তা শনাক্ত করা কঠিন। তিনি বলেন, ‘এআই ব্যবহার করে আক্রমণ ও অপপ্রচারের শিকার বেশি হচ্ছে জামায়াত। আমরা বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে একাধিকবার তুলেছি। তবে পদক্ষেপ সন্তোষজনক নয়।’
সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমের একটি ভিডিও প্রচার হচ্ছে। এতে দুজনকে খালি গায়ে লুঙ্গি পরে নাচতে দেখা যায়। যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে ফ্রন্টিয়ার্স ইন পলিটিক্যাল সায়েন্স জার্নালে ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। গবেষণাটিকে উদ্ধৃত করে ডিসমিস ল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওগুলো নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এসব ভিডিও ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের নামে এমন সব ভুয়া গল্প ছড়ানো হচ্ছে, যা ভোটাররা সত্য বলে ধরে নিচ্ছেন। ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের নির্বাচনে এআই চালিত ‘বট’ ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশে এ ধরনের আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল। গত ২৩ ডিসেম্বর রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের মতবিনিময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং গুজব মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জের কথা উঠে আসে। কিন্তু তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক শামীম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ, ভুয়া দাবি, অপতথ্য ও কু-তথ্যের ব্যবহার অতীতের নির্বাচনেও দেখা গেছে। তবে বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে এসব প্রচারণার গতি ও ব্যাপ্তি বহুগুণ বেড়েছে। ফলে এআইনির্ভর এই নতুন বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় তরুণ সমাজ, যারা প্রচলিত গণমাধ্যম বিশ্লেষণের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাদের ওপর এ ধরনের ভিডিওর প্রভাব বেশি পড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে এমন একটি পক্ষও সক্রিয় থাকতে পারে, যারা পরিকল্পিতভাবে পুরো নির্বাচনকাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ বা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে চায়।