আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেবে উপসাগরীয় দেশগুলো

March 14, 2026
1 month ago
By SAJ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেবে উপসাগরীয় দেশগুলো

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে তেহরান। তেহরানের দাবি, তারা মূলত এসব দেশের মার্কিন ঘাঁটি ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় প্রতিশোধমূলক হামলা চালাচ্ছে। সেখান থেকে হামলা বন্ধ হলে তারা পাল্টা জবাব থামিয়ে দেবে। এসব হামলা নিয়ে অঞ্চলটির দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিক, কিন্তু দেশগুলো এখনো এমন কিছু জানায়নি। এ পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের চরম ইরানবিদ্বেষী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিট হেগসেথ ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আর্লিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাচ্ছে।

হেগসেথের দাবি, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে পরিস্থিতি এখন ওয়াশিংটনের অনুকূলে রয়েছে।

হেগসেথের ভাষ্যমতে, ‘আমাদের সুবিধা কেবল বাড়ছে। এ ছাড়া আমাদের উপসাগরীয় মিত্ররা এখন আগের চেয়ে বেশি সক্রিয়। তারা ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছে।’

উপসাগরীয় দেশগুলো এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। তাই হেগসেথের এমন মন্তব্য এরই মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি আরও এমন কিছু বিষয় দাবি করেছেন, যা সত্য নয়।

উদাহরণ হিসেবে, একই সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথের আরেকটি মন্তব্যের কথা বলা যায়। সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। বাস্তব ঘটনা হলো, বিশ্বের জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ দিয়ে ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ বা ট্যাংকার চলাচল করতে পারছে না। ইরানের অনুমতি ছাড়া চললে হামলা চালানো হচ্ছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ওপর হামলা না চালাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তদবির করেছিল। তাদের ভয় ছিল, যুদ্ধ শুরু হলে তারা ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইতিমধ্যে কাতারের রাজধানী দোহা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই ও বাহরাইনের রাজধানী মানামায় ইরান হামলা চালিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইরান চাইলে এসব দেশে হামলার মাত্রা আরও বাড়াতে পারে বলে।

চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া এক প্রস্তাবে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সদস্যদেশগুলোতে ইরানের হামলার নিন্দা জানানো হয়, কিন্তু ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন নিয়ে ওই প্রস্তাবে কিছুই বলা হয়নি।

প্রস্তাবটিতে ভোটের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরানের আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে যাওয়া এখন আর কোনো স্লোগান নয়; বরং বাস্তব।

মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এখন নিজেরা আক্রান্ত হওয়ায় তারা ইরানের ওপর ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়ায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও নাখোশ।

উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারেনি। অনেক আঞ্চলিক বিশ্লেষক মনে করেন, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এ অঞ্চলে গড়ে ওঠা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোই এসব দেশকে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার প্রভাব

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি করা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান তা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এতে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।

হামলার মুখে কুয়েত, ইরাক, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব জ্বালানি উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ১৬টি তেলবাহী জাহাজ ও ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে।

পণ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যের বরাতে গত শুক্রবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো জ্বালানি খাতে আনুমানিক ১ হাজার ৫১০ কোটি ডলারের রাজস্ব হারিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাতার, বাহরাইন, আমিরাত ও কুয়েত।

এ পরিস্থিতিতে হেগসেথের উল্লিখিত দাবি উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। কারণ, ইরান আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যারা এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সমর্থন দেবে, তাদের ওপর কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।