বাংলাদেশ

৬ বছর ধরে চালহীন ‘জিরানোর ঘর’, দাঁড়িয়ে আছে শুধু ৯টি পাকা খুঁটি

August 6, 2026
2 weeks ago
By SAJ
৬ বছর ধরে চালহীন ‘জিরানোর ঘর’, দাঁড়িয়ে আছে শুধু ৯টি পাকা খুঁটি

সকাল গড়াতেই কুষ্টিয়ার কুমারখালীর উত্তর ভবানীপুর গ্রামের পাশের খরিলার বিল কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে। যত দূর চোখ যায়, মাঠ আর মাঠ। কোথাও চারা রোপণ চলছে, কোথাও পাট ধোয়ার ব্যস্ততা। শত শত কৃষক ও কৃষিশ্রমিক দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়েন কাজে।

দুপুরের দিকে সূর্যের তাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে। আবার কখন যে কালো মেঘ জমে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে আসে, তারও ঠিক নেই। কিন্তু কাজের ফাঁকে একটু ছায়ায় বসে জিরিয়ে নেওয়ার মতো কোনো আশ্রয় নেই তাঁদের।

বিলের মধুপুর-বরইচারা জিকে খালের উত্তর ভবানীপুর কালভার্টের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ৯টি পাকা খুঁটি যেন সেই অভাবের নীরব সাক্ষী। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে, কোনো অসমাপ্ত স্থাপনা। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি ছিল কৃষকদের ‘জিরানোর ঘর’। এখন মাথার ওপরের চাল নেই, দাঁড়িয়ে আছে শুধু ৯টি পাকা খুঁটি।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে টিনশেড ছাউনিটি নির্মাণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল—মাঠে কাজের ফাঁকে কৃষকেরা একটু বিশ্রাম নেবেন, দুপুরের খাবার খাবেন, শুকনা জায়গায় নামাজ পড়বেন কিংবা হঠাৎ ঝড়বৃষ্টি এলে আশ্রয় নেবেন। সেই স্বস্তি টিকেছিল অল্প সময়। ২০২০ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে উড়ে যায় টিনের চাল। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ঘরটিতে আর নতুন চাল ওঠেনি।

সোমবার দুপুরে খরিলার বিলে গিয়ে দেখা যায়, মাঠজুড়ে কাজ করছেন কৃষকেরা। কেউ ধানের চারা রোপণ করছেন, কেউ খালের পানিতে পাট ধুতে ব্যস্ত। আর চালহীন ঘরের ভেতরে শুকাতে দেওয়া হয়েছে কিছু পাটকাঠি। যে ঘরটি একসময় কৃষকদের আশ্রয় ছিল, সেটি এখন আর তাঁদের কোনো কাজে আসে না।

আমগাছের ছায়াই এখন ভরসারোদ থেকে বাঁচতে কয়েকজন কৃষক আশ্রয় নিয়েছেন পাশের একটি ছোট আমগাছের নিচে। কেউ বসেছেন নলকূপের পাশে। আমগাছের ছায়ায় বসে নিজের আক্ষেপের কথা বলছিলেন উত্তর ভবানীপুর গ্রামের কৃষক দুলাল সেখ। তাঁর ভাষ্য, ‘এই বিলে হাজার হাজার বিঘা জমি। প্রতিদিন শত শত লোক খাটতে আসে। আগে কাজের ফাঁকে এই ঘরে একটু বসতাম, খাওয়াদাওয়া করতাম, নামাজ পড়তাম। আম্ফানের পর থেকে চাল নাই। সারা দিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে খাটতে হয়। দুপুরবেলা একটু জিরানোর জায়গা পর্যন্ত নাই।’

ঝড় এলেই ছুটতে হয় প্রাণ বাঁচাতেখোলা মাঠে কাজ করতে গিয়ে কৃষকদের সবচেয়ে বড় ভয় আকস্মিক ঝড় আর বজ্রপাত।

বরইচারা গ্রামের কৃষক চয়েন উদ্দিনের ভাষায়, ঝড়বৃষ্টি আসলেই হুট করে বাড়ির দিকে ছুটতে হয়। খোলা মাঠে বজ্রপাতের ভয়। ছাদটা ঠিক করে দিলে অন্তত একটা আশ্রয় হতো।

মাঠে কাজ করার সময় অন্য এক কষ্টের কথা তুলে ধরলেন কৃষক বদর উদ্দিন। তাঁর কাদামাখা হাত দুটি দেখিয়ে বললেন, ‘মাঠে চারদিকে কাদা। একটু যে শান্তিমতো নামাজ পড়ব, সে জায়গাও তো নাই। সরকারের কাছে একটাই দাবি—ঘরটার চালটা যেন তাড়াতাড়ি বানিয়ে দেয়।’

সমস্যার কথা জানে প্রশাসনওকৃষকদের এই দুর্ভোগের কথা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও অজানা নয়। যদুবয়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান জানান, ঘরটি আগের চেয়ারম্যানের সময়ে নির্মিত হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়ে চাল উড়ে যাওয়ার পর সেখানে স্থায়ী ও পাকা ছাদ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

কুমারখালী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. কাওছার আলী বলেন, মাঠে কাজের ফাঁকে কৃষকদের বিশ্রাম ও নিরাপত্তার জন্য এমন ছাউনি প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে বলে জানান কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে সেখানে স্থায়ী চাল নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।