খেলা

ডারউইন টেস্টের পঞ্চম দিনে মিচেল স্ট্রিটে অলস ‘ক্রিকেট’

August 17, 2026
1 day ago
By SAJ
ডারউইন টেস্টের পঞ্চম দিনে মিচেল স্ট্রিটে অলস ‘ক্রিকেট’

মিচেল স্ট্রিট রাতেই বেশি সজাগ, ভরদুপুরে নীরব। সেই নীরবতা আজ খানিকটা ভাঙল বাংলাদেশিদের পদচারণে। টিম হোটেল এবং সিরিজ কাভার করতে আসা বাংলাদেশের সাংবাদিকদের হোটেল–মোটেলগুলো কাছাকাছি বলে ডারউইন সিটি সেন্টারের এই সড়কে ছোটখাটো একটা মিলনমেলাই হয়ে গেল যেন!

তানজিদ হাসানকে সঙ্গে নিয়ে খেতে বের হয়েছিলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। তাঁদের খাবার টেবিলে ঢুঁ দিয়ে অবশ্য ‘আহার’–বিশেষ কিছু মিলল না। ‘আহার’ বলতে লেখার উপজীব্য কিছুকেই বোঝানো হচ্ছে আসলে। গল্প–আড্ডায় তাঁদের আপত্তি নেই, তবে ছুটির দিনে ক্যামেরা–মাইক্রোফোনের সামনে কেইবা দাঁড়াতে চায়! সাংবাদিকদের অনুরোধে অবশ্য সন্ধ্যায় নিজেই কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন দলের ম্যানেজার ও জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার নাফিস ইকবাল।

আজকের দিনটা এমনিতে ছুটির ছিল না, ছিল ডারউইন টেস্টের পঞ্চম ও শেষ দিন। মারারা স্টেডিয়ামে শেষ দিনের খেলা চললে দুপুরের এই সময়টায় খেলোয়াড়দের থাকার কথা ছিল মাঠে আর সাংবাদিকদের প্রেসবক্সে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে সহজে হারানোর আনুষ্ঠানিকতা যেহেতু চতুর্থ দিন চা–বিরতির মধ্যেই শেষ, পঞ্চম দিনটা হয়ে গেল ছুটির। ডারউইনের আনন্দময় স্মৃতি নিয়ে থেকে আগামীকাল সকালে ম্যাকাইয়ের ফ্লাইট ধরবে দল।

ছুটির দিনে কেবলই অবসর, তবে সন্ধ্যায় বাংলাদেশ দলের সম্মানে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন নৈশভোজের আয়োজন করেছে, যেটি হওয়ার কথা এসপ্ল্যানেডে দলের হোটেল ডাবল ট্রি বাই হিলটনে। এই একটি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া ডারউইন টেস্টের পঞ্চম দিনটি পুরোপুরি বিশ্রামেই কাটিয়েছে বাংলাদেশ দল।

খেতে এসে নাজমুল, তানজিদ আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলেননি, তবে আজকাল সব সময় তা লাগেও না। রিলস আর ভিডিওর জন্য সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেই চলে। মিচেল স্ট্রিটের হাঁটার রাস্তায় সে রকম কিছু সুযোগ তাঁরাও দিলেন। ভিডিও হলো, ছবি উঠল ক্লিক ক্লিক।

ঠিক এ সময়েই আবার সোনায় সোহাগা হয়ে রাস্তা পার হয়ে সেখানে হাজির পেসার তাসকিন আহমেদ। কিছু সময় পর ওই একই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেন কোচ ফিল সিমন্স, আরেকটু পর পেসার খালেদ আহমেদও। অলস দুপুরে ডারউইনের মিচেল স্ট্রিট যেন হঠাৎই বাংলাদেশ সরণি! হাঁটাচলার ফাঁকে কখনো নাজমুল–তানজিদ, কখনো তাসকিনের সঙ্গে কথা বলতে দেখে সাংবাদিকদের দিকে এগিয়ে এলেন এক পথচারী। যেহেতু খেলার খোঁজখবর রাখেন, অস্ট্রেলিয়ানই হবেন হয়তো। ‘বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিল! খুব ভালো খেলেছ তোমরা। পরের টেস্টেও নিশ্চয়ই ভালো খেলবে’—বলে হাসিমুখে অভিনন্দন জানিয়ে গেলেন ভদ্রলোক।

অস্ট্রেলিয়া আসার পর থেকে এই একটা জিনিস পেয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সম্মান, ভালোবাসা, অভিনন্দন, শুভকামনা। নিজেদের শোচনীয় হারের জ্বালাটা বুকে লুকিয়েই বিজয়ীদের হাসিমুখে অভিনন্দন জানাতে পারেন তাঁরা। গতকাল ম্যাচ শেষে মেহেদী হাসান মিরাজ যেমন জানিয়েছেন হোটেলে এক বৃদ্ধার কাছ থেকে প্রশংসা পেয়ে অবাক হওয়ার কথা। মিরাজ অবাক; কারণ, এত বয়স্ক একজন মানুষও খেলার খোঁজ রাখেন, আবার বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের চেনেনও!

মিচেল স্ট্রিটেই আছে ইস্তাম্বুল রেস্টুরেন্ট, যার মালিক গ্রিসের নিক নামের এক ভদ্রলোক। ৩৫ বছরের বেশি হলো তিনি ডারউইনবাসী, এখন তো পরিবার নিয়েই থাকেন। বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা ইস্তাম্বুলে খেতে যাচ্ছেন, ক্রিকেটাররাও মাঝেমধ্যে আসছেন; সেই বাংলাদেশ আবার অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছে—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ যেন কিছুটা নাড়িয়ে দিয়েছে নিককেও। অবশ্য বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর আগ্রহের আরেকটি কারণ; ইস্তাম্বুল রেস্টুরেন্টে দুজন বাংলাদেশিও কাজ করেন।

বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে বলে খুশি নিক, তবে একটা কারণে মন খারাপও আছে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ডারউইনে এত বছর পর হওয়া টেস্ট ম্যাচ দেখতে সারা দেশ থেকে প্রচুর দর্শক আসবেন, ডারউইনের ব্যস্ততম এলাকা মিচেল স্ট্রিট জমে উঠবে, ব্যবসা ভালো হবে। কিন্তু নিকের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। প্রখর রোদে জ্বলতে থাকা খাঁ খাঁ সড়কের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘ম্যাচটা তো ডারউইন দলের ম্যাচ নয়, অস্ট্রেলিয়া দল খেলেছে। অস্ট্রেলিয়ার মানুষ অন্য শহর থেকে আসবে না খেলা দেখতে! আজব।’

রাশিয়া–ইউক্রেন আর ইরান–ইসরাইল মিলে সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে যে মন্দা হাওয়া বইয়ে দিয়েছে, তা নিককেও চিন্তিত করে। একে তো অস্ট্রেলিয়ায় আয়রোজগার কমে যাচ্ছে, তার ওপর জিনিসপত্রের দাম দিন দিন আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। তেলের দামে এখানেও ঊর্ধ্বগতি। এসবের প্রভাবে ট্যুরিস্ট কমে যাচ্ছে দিন দিন। টাকা নেই, মানুষ ঘুরবে কী দিয়ে! নিক তাই ঠিক করেছেন, গ্রিসে গিয়ে নিজে একটা রেস্টুরেন্ট খুলবেন। সেটাও চালাবেন, ডারউইনেও চলবে ইস্তাম্বুল।

নিকের রেস্টুরেন্টে দাঁড়িয়েই গল্পের ছলে তাসকিনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বাংলাদেশের পেস বোলিং নিয়ে। তাঁর কথার সারমর্ম, পেসাররা ডারউইন টেস্টে ভালো বোলিং করলেও সেটা করতে হয়েছে কষ্ট করে। নইলে ডারউইনের উইকেটে বোলিং করাটা সহজ ছিল না। উদাহরণ তো সামনেই—অস্ট্রেলিয়ার পেসাররা এত ভালো, তবু তারা কি পেরেছে নিজেদের সেরা বোলিংটা করতে!

কথার ফাঁকে তাসকিন একটু আফসোস করলেন চোটের কারণে এই সিরিজে না খেলা আরেক পেসার নাহিদ রানার জন্য। হাত দিয়ে বোলিংয়ের ভঙ্গি করে বললেন, ‘এই উইকেট পুরোনো বলে নাহিদ ভালো করত। ওর জন্য ভালো হতো।’

সব অলস দুপুর বুঝি এ রকমই হয়। এলায়িত আড্ডায় ভর করে হাসি–আনন্দ, পাওয়া না–পাওয়ার কথা। মারারা ওভালের ক্রিকেট চলে আসে মিচেল স্ট্রিটে, খুলে যায় মনের জানালা।