‘এই একটি সিদ্ধান্তেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বদলে যেতে পারে’
February 3, 2026
2 months ago
By SAJ
প্রশ্ন: পাকিস্তান টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলবে, কিন্তু ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে না। এই সিদ্ধান্তকে আপনি কীভাবে দেখছেন?রশিদ লতিফ: এটা পাকিস্তান সরকারের একটা অনেক বড় সিদ্ধান্ত। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে হওয়া বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে তারা ভারতের বিপক্ষে খেলবে না। এটাকে একটি প্রতিবাদ মনে করতে পারেন। অথবা অতীতে যা ঘটেছে, সম্ভবত সেটা দেখেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এবং আইসিসিতে বড় পরিবর্তন আসবে। তাদের সিদ্ধান্তগুলোতে হয়তো অনেক পরিবর্তন আসবে। এ নিয়ে অনেক নেগোসিয়েশন হবে। তবে সম্ভবত এই একটি সিদ্ধান্তেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বদলে যেতে পারে।প্রশ্ন: বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র পাঁচ-ছয় দিন বাকি। এই সময়ে এমন সিদ্ধান্ত কতটা বিস্ময়কর?রশিদ লতিফ: আমি মনে করি, এর টাইমিংটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারতের বিপক্ষে না খেলার সিদ্ধান্তটি অনেক ভেবেচিন্তেই নেওয়া হয়েছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আসতে পারে। কিন্তু এটি সরকারের সিদ্ধান্ত, তাই খবরটি সরাসরি সরকারের পক্ষ থেকেই এসেছে, ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে নয়। আরও পড়ুনআইসিসি কীভাবে আয় করে, কারা কত টাকা পায়, ভারত কেন সবচেয়ে বেশি পায়৯ ঘণ্টা আগেপ্রশ্ন: কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?রশিদ লতিফ: অতীতের দিকে তাকালে দেখবেন—চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হোক বা এশিয়া কাপ, ভারত সব সময় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়েছে আর পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত হাইব্রিড মডেলে রাজি হয়েছে। বছরের পর বছর এটাই হয়ে আসছে। তবে এখন সম্ভবত ভূরাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। সামনে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আপনিও জানেন, সেখানে কী হচ্ছে। এসব নির্বাচনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকার যখন সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এসব বিষয়ও তাদের মাথায় থাকে। ক্রিকেটের ব্যাপার তো আছেই। তারপর হ্যান্ডশেক নিয়ে যা হয়েছে, সেটাও একটা ব্যাপার ছিল। সেই কাজটা ঠিক হয়নি। খেলা বা না খেলা আলাদা বিষয়, কিন্তু ক্রিকেটের একটা স্পিরিট থাকে, যা কখনো হারানো উচিত নয়। এমনকি ভারতের মানুষজনও সম্ভবত বিষয়টি ভালো চোখে দেখেনি। কারণ, আমরা জানি তারা ও রকম লোক নয়। আমরা সবাইকে চিনি, তারা আমাদের সঙ্গে থেকেছে, আমরা একসঙ্গে খেলেছি, খেয়েছি, আমরা ওদের সব খেলোয়াড়কে চিনি। তাই সরকারের নির্দেশে হওয়া ওই ঘটনায় সম্ভবত তারাও অনেক কষ্ট পেয়েছে। এরপর পাকিস্তান এশিয়া কাপের ট্রফি ফেরত দেয়নি, সেটাও একটা রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপর বাংলাদেশের সঙ্গে যা ঘটেছে, মোস্তাফিজের এপিসোডটির কথা যদি ধরি, (ভারত) সরকারের কিছু লোক মোস্তাফিজকে নিয়ে ভুল প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেছিল। সে শুধু একজন খেলোয়াড়, কয় দিন খেলে চলে যেত। কিন্তু সম্ভবত তাকে রাজনৈতিক কারণে ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার কারণে পুরো বাংলাদেশ বোর্ড প্রতিক্রিয়া দেখাল। তাই এই রাজনীতির বিষয়টিকে আপনি আলাদা করতে পারবেন না। এটা ক্রিকেটের একেবারে পাশাপাশিই চলছে। সামনে নির্বাচনও আছে। বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানের সমর্থন এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সুতরাং এটা আইসিসির জন্য একধরনের হুমকি যে আপনারা আলোচনার টেবিলে আসুন, কথা বলুন।ক্রিকেট–বিশ্বে চলমান অস্থিরতা নিয়ে কথা বলেছেন পাকিস্তানের সাবেক উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান রশিদ লতিফরশিদ লতিফের ফেসবুকপ্রশ্ন: ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের যে টানাপোড়েন, তাতে পাকিস্তানের কি বাংলাদেশের ইস্যুতে জড়ানো উচিত ছিল?রশিদ লতিফ: হ্যাঁ, অবশ্যই উচিত ছিল। নাজাম শেঠি, জাকা আশরাফ, রমিজ রাজা কিংবা বর্তমান—যার আমলই হোক না কেন, পিসিবি সব সময় পিছিয়েই থাকে। আমরা হাইব্রিড মডেল মেনে নিয়েছিলাম, যার পক্ষে আমি কখনোই ছিলাম না। ২০২৩ সালে পাকিস্তান এই শর্তে ভারতে গিয়েছিল যে ভারত পরে পাকিস্তানে আসবে; কিন্তু সেটি আর ঘটেনি। সম্ভবত এটাই সময় ছিল বাংলাদেশের সাহায্য নেওয়ার বা তাদের পাশে দাঁড়ানোর। বাংলাদেশ একা এই পদক্ষেপ নেয়নি, পাকিস্তান অবশ্যই পেছনে ছিল। ‘ব্যাকডোর ডিপ্লোমেসি’ যেভাবে চলে, সেভাবেই কাজ হয়েছে। পাকিস্তানও এখানে একা নয়। তবে পুরো ক্রিকেটবিশ্ব সরাসরি বিসিসিআইয়ের বিরুদ্ধে যেতে পারবে না। কারণ, তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার বোর্ড তাদের ওপর চলে। পাকিস্তান যেহেতু ভারতের সঙ্গে কোনো দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলে না, তাই পাকিস্তানের কোনো ক্ষতি নেই। পাকিস্তানও এর আগপর্যন্ত লড়তে পারছিল না, কিন্তু এখন তারা সাহস দেখিয়েছে। এটা কোনো যুদ্ধ নয়, এটি যুক্তি আর নীতির কথা। বাংলাদেশ যদি নিরাপত্তার শঙ্কার কথা বলে, যদি বলে তারা ভারতে নিরাপদ নয়, তবে আইসিসি কীভাবে বলতে পারে যে ভারত নিরাপদ? আইসিসি হঠাৎ করে বলতে পারে না যে এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ দেশ। আপনাদের নেতারা বিবৃতি দিয়েছেন, মোস্তাফিজ এলে তাকে বিমান থেকে নামতে দেওয়া হবে না। এটা অন রেকর্ড আছে। আমি টিভিতে টক শো করি, তাই আমি সব সেভ করে রাখি, কে কী বিবৃতি দিল।আরও পড়ুনআইসিসি কেন পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে পারবে না, বললেন সাবেক চেয়ারম্যান১৮ ঘণ্টা আগেপ্রশ্ন: আইসিসি এর ফলে কতটা চাপে পড়বে?রশিদ লতিফ: যদি পরিস্থিতি না বদলায় তবে আইসিসি বড় ধরনের আর্থিক হুমকির মুখে পড়বে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ যদি বেরিয়ে যায় তাহলে এসিসি কীভাবে চলবে? সনি বা জিও স্টার ৮-১০ বছরের যে বিলিয়ন ডলারের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়েছে, তা বাতিল করে দেবে। তখন সব চাপ আইসিসির ওপর পড়বে। এশিয়া কাপে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে চারবার খেলা হয়েছে, এর সুবিধাভোগী কে ছিল? এসিসি ও আইসিসি।পাকিস্তানের সাবেক উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান রশিদ লতিফএক্সপ্রশ্ন: সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির কথা ভেবে পাকিস্তান কি এই সিদ্ধান্ত পরে বদলাতে পারে?রশিদ লতিফ: পাকিস্তানের ক্ষতি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নিষেধাজ্ঞাও আসতে পারে। তবে পাকিস্তানের ক্ষতি হলে আরও ১০০টি দেশেরও ক্ষতি হবে। আইসিসির টাকা কমে যাবে। আইসিসির বাজেট তো তাদের সব সদস্যকে ফান্ডিং করার জন্য। এই হুমকি বা আলোচনার বিষয়টি শুধু এই বিশ্বকাপের জন্য নয়। ২০২৬-এ নারী বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডে, ২৭-এ দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ, টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ, তারপর ভারতে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি এবং ৩১-এ বাংলাদেশ-ভারতে বিশ্বকাপ—অনেক লম্বা পথ। যদি অনূর্ধ্ব-১৯ বা নারীদের কোনো ম্যাচও না হয়, তবে ক্রিকেট অর্থনীতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসিসি তো শেষই হয়ে যাবে। তাদের কাছে বড় দেশ বলতে ভারত ছাড়াও তো শুধু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানই আছে, যারা টেস্ট খেলে। ব্রডকাস্টাররা এটি মেনে নেবে না। পাকিস্তান সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা তারা ভালোভাবেই জানে। এটি ক্রিকেটের চেয়েও বড় কিছু, এটি সরকারের পলিসি। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছে, নিজেদের শক্তির আন্দাজ পেয়েছে। তাই তারা ভেবেছে, এর আগে আমরা কখনো এটা করিনি, এবার করে দেখি।আরও পড়ুন‘এখনই সময়’ বলে আইসিসিকে কী পরামর্শ দিলেন আফ্রিদি০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬প্রশ্ন: গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি যদি না হয়, তবে পাকিস্তান কি খুব সহজে সুপার এইট বা পরের ধাপে যেতে পারবে?রশিদ লতিফ: সর্বশেষ আমরা যে ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেললাম, সেখানে কোয়ালিফাই করিনি। ভারতে খেললাম, সেখানেও কোয়ালিফাই করিনি। তাই পাকিস্তান কোয়ালিফাই করবে কি করবে না, সেটা তারা ভাবছে না, আইসিসি ভাবছে। পাকিস্তান যদি সুপার এইটে যায় এবং ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ পড়ে আর পাকিস্তান যদি সেই ম্যাচও না খেলে, তাহলে আরও জটিল পরিস্থিতি হবে। তবে আমার মনে হয় পাকিস্তান ঠিকই কোয়ালিফাই করবে। কারণ, নামিবিয়া, যুক্তরাষ্ট্র বা নেদারল্যান্ডসকে স্পিন-ট্র্যাকে হারানোর সামর্থ্য আমাদের আছে—যদি না বৃষ্টি বাগড়া দেয়। সব মিলিয়ে এটা একধরনের ‘চেকমেট’।প্রশ্ন: তাহলে আপনার কি মনে হয়, বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ শেষ পর্যন্ত হবে না?রশিদ লতিফ: আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত ম্যাচ হবে। ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ম্যাচটা হবে এবং এর সমাধান ইসলামাবাদ ও দিল্লিতে হবে। কারণ, ব্যবসায়ীরাই খেলাটা চালায়। তাদের বিশাল প্রভাব এখানে। দিল্লি ও ইসলামাবাদই সিদ্ধান্ত নেবে এবং আইসিসি তা মেনে নেবে। আমাদের চেয়ারম্যানও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনাদের বিসিসিআইয়ের যিনি আইসিসিতে আছেন তিনিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে। তাই তাঁরা দুজনই আসলে সরকারের অংশ, তাঁরাই সিদ্ধান্ত নেবেন।আরও পড়ুনভারত–পাকিস্তান ম্যাচ না হলে লোকসান ৬ হাজার কোটি টাকা, কার কত০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুনসাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুনসাক্ষাৎকার২০২৬ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপক্রিকেটপাকিস্তান ক্রিকেটবাংলাদেশ ক্রিকেট